ড. ফাল্গুনী রানী চক্রবর্তী, সহকারী অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ, বদলগাছি, নওগাঁ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অদূরে তিতাস নদী-তীরবর্তী গোকর্ণঘাট গ্রামে এক জেলে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ক্ষণজন্মা অদ্বৈত মল্লবর্মণ।
তিতাস-পাড়ের মালোদের জীবন-জীবিকা নিয়ে তিনি যে কেবল এক মনোজ্ঞ সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন তা নয়, ওরা যে তার জীবনেরই অংশ। মালোরাই চাঁদা তুলে তাঁর পড়ার খরচ চালাতো। যখন পিতা মাতার স্নেহ-শাসন-সোহাগে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার কথা, সেই শিশুকালেই তিনি পিতৃমাতৃ ৃহারা হয়ে নিঃসঙ্গ জীবন সংগ্রামে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ এ ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হলেও শেষাবধি শেষ করা হয়ে ওঠেনি। জীবিকার সন্ধানে কলকাতা গমন করেন। কলকাতার মাসিক ‘ত্রিপুরা’ পত্রিকায় কর্মজীবন শুরু, কিছু দিন পর ‘নবশক্তি’ তে যোগদান। ‘নবশক্তি’র প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে মাসিক ‘মোহাম্মদী’-তে নিয়োগ লাভ করেন। নবযুগ, কৃষক, যুগান্তর, দেশ প্রভৃতি পত্রিকায় কাজ করেছেন। এক সময় বিশ্বভারতীর প্রকাশনা বিভাগের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। কিশোর ছাত্র অদ্বৈতের বিদ্যালয়ের দেয়াল পত্রিকা ‘সবুজ’-এ ‘তিতাস’ কবিতার প্রকাশের মধ্যেই নিহিত ছিলো ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের স্বপ্নবীজ। একদিকে আর্থিক টানাপোড়েন, অন্যদিকে নিয়ত সংগ্রামী চিত্তে তিতাস পাড়ের মানুষগুলোর জন্য অপার ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে উপন্যাস লিখতে।
কলকাতায় সীমিত আয়ের কিছু অংশ মালোপাড়ার শিশু-কিশোরদের পড়ালেখার জন্য ব্যয় করতেন। তিতাস পাড়ের মানুষগুলোর জন্য একধরনের দায়বদ্ধতা তাঁকে সারাজীবন ভাবিয়েছে। তাঁর বন্ধুরা অকপটে বলেছেন : ‘আমরা চিরকাল অদ্বৈতকে তাহার মুষ্টিঅন্ন বহুজনের সঙ্গে ভাগ করিয়া খাইতে দেখিয়াছি।’ জ্ঞানচর্চা আর অর্ধাহারে অনাহারে শীর্ণ, ক্লিষ্ট মানুষগুলোর প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকেও বহুদিন অনাহার আর অর্ধাহারে থাকতে বাধ্য করেছে। তিতাস আর তিতাস পাড়ের মানুষগুলোর প্রতি দরদ ছিলো যতটা, নিজের প্রতি অযত্ন-অবহেলা ছিলো তার চেয়ে বেশি। ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন-মন-সকলি দাও/তার চেয়ে সুখ কোথাও কী আছে, আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’এই ছিলো অদ্বৈত মল্লবর্মণের সকাল-সন্ধার-ধ্যান-জ্ঞান।
১৯৪৮ এ যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে কাঁচপাড়া যক্ষা হাসপাতালে ভর্তি হন। বন্ধু এবং হিতৈষীদের সহযোগিতায় সেবারে মতো বেঁচে ফিরে এলেন কলকাতার ষষ্টিতলার বাড়িতে। কিন্তু আবার হঠাত্ বেড়ে গেলো পুরোনো রোগ। শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমবেত চেষ্টাতেও তাঁকে হাসপাতালে রাখা গেলো না। হাসপাতাল থেকে এলেন পালিয়ে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ চাননি তাঁর জন্য সকলেই উদ্বিগ্ন হোক। নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হতো-সকলের সেবার প্রসারিত হাত দেখে। যিনি সকলের সেবায় নিজেকে উত্সর্গ করেছেন তিনি আর কাউকেই তাঁর সেবার ভার নেবার সুযোগ না দিয়ে ১৯৫১ এর ১৬ এপ্রিল ষষ্টীতলার বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাষ ত্যাগ করেন।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের যে তিতাসের বুক ভরা ঢেউ ভেঙ্গে এক সময় তরতর করে পাল উড়িয়ে চলেছিলো নৌকোর সারি, আজ সেই তিতাসের বুক চিরে বিকল্প রাস্তা তৈরি হয়েছে। বুকভরা ঢেউ নেই, তিতাস পাড়ের মালোদের জীবন ও জীবিকাতেও এসেছে বৈচিত্র্য। তবে ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি কারো। অভাব-অনটন তাদের নিত্যসঙ্গী। প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়া চললেও এর পরে আর হয় না।
বাংলাদেশের একটি অঞ্চলের মানুষের জীবনচিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। তিনি একটি মাত্র গ্রন্থ লিখে বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ