ড. জাফরুল্লাহর বক্তব্য সুখকর নহে

শুক্রবার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাহ্যিক বিনয় প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, ‘আমাকে যদি বলে, যদি আমার নাম আগে আসে, আমি টিকা নিয়ে নেব। তবে আমি চাই যে আমার প্রধানমন্ত্রী আগে নেবেন।’ ইহা তিনি দ্বিতীয়বার উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন, ‘আমরা আশা করি, সবাই ভ্যাকসিন পাবেন। তবে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথমে টেলিভিশনে সরাসরি ভ্যাকসিন গ্রহণ করিবেন।’ তাহার এই কৌশলী বক্তব্যে জাতি হতাশ হইবে বলিয়া আমরা মনে করি। জাতি এত বোকা নহে, তাহাদের বোকা ভাবিয়া বক্তব্য রাখাও সমীচীন নহে। তিনি কী বলিতে চাহিতেছেন, তাহার এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ কী তাহা জাতির নিকট মোটেই অপরিষ্কার নহে।  অধিকন্তু এই বক্তব্য আমাদের নিকট রীতিমতো অশালীন বলিয়া মনে হইয়াছে। তিনি জ্ঞানী মানুষ, একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তাহার সঙ্গে রহিয়াছে পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নিবিড় যোগাযোগ। আমরা তাহার প্রশংসাই করিতে চাই। কিন্তু সেই আস্থা রাখিতে পারিতেছি কই?

তিনি দেশের প্রধান নির্বাহীকে প্রথমে সরাসরি টেলিভিশনে ভ্যাকসিন লইয়া জাতির কাছে  প্রমাণ করাইতে বলিতেছেন যে এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা আছে! ইহা কি একটি রসিকতা নাকি? জনাব ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রতি আমাদের পরামর্শ থাকিবে, আপনার মনের মধ্যে কোনো প্রশ্ন থাকিলে আপনি তাহা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অথবা সংশ্লিষ্টদের কাছে জানিতে চাহিতে পারেন। কিন্তু মূল বক্তব্য কেমোফ্লেজ করিবার প্রয়োজন কী? বর্তমান এই প্যানডেমিকের সময়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। দেশে ভ্যাকসিন লইয়া, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা লইয়া একধরনের লোক গুজব ছড়াইতে চেষ্টা করিতেছে, মানুষের মধ্যে ভ্যাকসিন লইয়া সংশয় তৈরি করিতে রীতিমতো প্রচারে নামিয়াছে। চিকিত্সাবিজ্ঞানের সঙ্গে পেশাগতভাবে নিবিড় থাকিয়াই আপনি জানেন, যাহাদের অ্যালার্জি আছে, যাহাদের একটু বয়স হইয়াছে, তাহাদের কাহারো কাহারো মধ্যে নানাবিধ পোস্ট ভ্যাকসিন কমপ্লিকেসি দেখা দিতে পারে। অস্বাভাবিক নহে। দেশে বহুকাল ধরিয়া কার্যকর যেই সকল টিকা রহিয়াছে, তাহা গ্রহণ করিলে আপনি সেই কাজ সাড়ে  ১৬ কোটি মানুষের দেশের ব্যস্ত প্রধান নির্বাহীকে করিতে পরামর্শ দিয়া বিব্রত করিতে চেষ্টা করিয়াছেন বলিয়া পরিষ্কার ফুটিয়া উঠিয়াছে। ইহাও পরিষ্কার যে, আপনার বক্তব্যের মধ্যে সরলতা নাই, আছে ধৃষ্টতা। আপনি নিজে চিকিত্সক, দেশের নির্বাহীর চাইতে আপনার ভ্যাকসিন গ্রহণ করিয়া জাতিকে আস্থায় আনা বেশি ফলপ্রসূ হইতে পারে। কারণ, বিষয়টি চিকিত্সাবিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত। সুতরাং ইহা আপনার একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য বলিয়া কেহ ধরিয়া লইলে তাহা উড়াইয়া দেওয়া যাইবে না।

এই সকল কৌশল, চতুরতার আশ্রয় লইবার কারণেই জনগণের সঙ্গে ড. জাফরুল্লাহদের মতো ব্যক্তিদের সম্পর্ক গড়িয়া উঠিতে পারে না। তাহারা গণমাধ্যমে ভালো আসন পাইলেও রহিয়া যান গণবিচ্ছিন্ন। অধিকন্তু সমাজে তৈরি হয় সংঘাত, সহিংসতা ও বিশ্বস্ততার অভাব। ইতিমধ্যেই সমাজ যথেষ্ট সংঘাতপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। এই রকমের আচরণে আরো সংঘাতপূর্ণ হইয়া উঠিতে পারে। এই ধরনের ভূমিকার কারণেই সমাজে ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতিও আস্থা তৈরি হয় না। চতুর্দশ শতাব্দীর ইতালীয় কবি দাঁতে এলিঘিয়েরি বলিয়াছিলেন, ‘একটি জাতির দুর্দশার সময়ে যাহারা সুযোগ খুঁজিতে থাকে, কৌশলী খেলা খেলিতে থাকে তাহাদের স্থান নরকের সবচাইতে অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে।’ আমরা ড. জাফরুল্লাহর মতো মুক্তিযোদ্ধা ও একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এমন কথা বলিতে পারি না। উহা শোভন হইবে না। কিন্তু জাতির একটি সংকটকালে কাহারো ভূমিকা অস্পষ্ট হইলে, কেহ কূটকৌশলী হইতে চেষ্টা করিলে তাহা কতটা গুরুতর অন্যায় হইবে, উহা কবির এই বক্তব্য হইতে বুঝিয়া লইতে অনুরোধ রাখিতে পারি অন্তত।