প্রযুক্তির কল্যাণে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে ঢাকা রেঞ্জের ৯৬টি থানার কার্যক্রম। বিষয়টি খোদ মনিটরিং করছেন রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অপরদিকে প্রতিটি থানার ডিউটি অফিসারের টেবিলে রাখা হয়েছে একটি করে চকলেটের বাটি। যারা থানায় সেবা নিতে আসছেন তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে একটি করে চকলেট। গত ২ ডিসেম্বর থেকে সিসিটিভিতে থানার কার্যক্রম মনিটরিং করার এ কার্যক্রম শুরু করে ঢাকা রেঞ্জ পুলিশ। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ঢাকা রেঞ্জের ১৩টি জেলায় ৪৩টি সার্কেলে ৯৬টি থানা রয়েছে। এসব থানায় প্রতি দিন ২০ হাজার চকলেট খেতে পারছেন থানায় সেবা পেতে আসা মানুষজন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পুলিশের ৮ রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের মধ্যে একমাত্র ঢাকা রেঞ্জের ৯৬টি থানার কার্যক্রম সিসিটিভিতে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
সেগুনবাগিচাস্থ ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের দপ্তর থেকে ৯৬ থানা-পুলিশের কার্যক্রম মনিটরিং করতে বসানো হয়েছে এসব সিসিটিভি। ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে। ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে থানাগুলোর ডিউটি অফিসার, হাজতখানা ও নিরাপত্তারক্ষীর অবস্থান। এসব কার্যক্রম সিসিটিভিতে মনিটরিংয়ে জন্য এখানে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছেন পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) উপ-পরিদর্শক (এসআই) পর্যায়ের ১৪ কর্মকর্তা। আর তাদের দেখভাল বা তদারকি করছেন একজন পরিদর্শক। একযোগে দেখা যাচ্ছে কোন থানাহাজতে কতজন আসামি, তাদের জন্য কী কী ব্যবস্থা করা হচ্ছে ইত্যাদি। অকারণে কোনো আসামিকে ধরে আনা হলে তার জন্য জবাবদিহিতা করতে হয় থানার সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের। সিসিটিভিতে থানার কার্যক্রম মনিটরিং করার কারণে এখন আর হয়রানি করতে কাউকে ধরে আনার সুযোগ নেই বললেই চলে।
জবাবদিহিতা
সিসিটিভি বসানোর পর থানায় কোনো লোক ১০ মিনিটের বেশি সময় বসে থাকলে ডিউটি অফিসারের কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি কি জন্য এসেছেন এবং কেন বসে আছেন। ডিউটি অফিসার তার কোনো উত্তর দিতে না পারলে আগত ব্যক্তির কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি কেন এসেছেন এবং তাকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে কি-না? থানায় এসে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন এমন অভিযোগে বেশ কয়েক জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে।
থানা নিয়ে ভোগান্তির শেষ নেই
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান বলেন, পুলিশি সেবার মূল কেন্দ্র হলো থানা। কিন্তু থানা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। সে কারণেই থানার কার্যক্রম মনিটরিং করতে ঢাকা রেঞ্জের ৯৬ থানায় বসানো হয়েছে তিনটি করে ক্যামেরা। এখন নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সব কার্যক্রম মনিটরিং করা হচ্ছে। চাইলে নিয়ন্ত্রণক্ষ থেকে ক্যামেরাগুলো ৩৬০ ডিগ্রি কোণে ঘুরিয়েও আশপাশের দৃশ্য দেখা যায়। পাশাপাশি থানার গেটে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, দুর্ব্যবহার করাসহ ক্ষেত্রবিশেষে আসামি বা তার স্বজনদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ আসে। এছাড়া নারী ও শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে কি-না, ডিউটি অফিসারের কক্ষে একই লোক বারবার আসছে কি-না, সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে সেন্ট্রি (দায়িত্ব পালনকারী কনস্টেবল) কেমন আচরণ করছেন, সেন্ট্রি রাতে কলাপসিবল গেটে তালা দিয়ে ভেতরে বসে আছে কি-না, এসব বিষয়গুলোও মনিটরিং করা হচ্ছে। নিয়ম অনুসারে প্রতি থানায় প্রতি দিন ভোরে এবং রাত ১০টার পর হাজতিদের বিষয়ে তথ্য নেওয়া, হাজতখানায় কোনো অস্বাভাবিক বিষয় দেখা যায় কি-না, নারী হাজতি থাকলে নারী সেন্ট্রি আছে কি-না, হাজতখানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সেখানে শীতকালীন কম্বল আছে কি-না, হাজতখানায় আসামিদের আত্মীয়স্বজন খাবার দিচ্ছে কি-না, হাজতির সঙ্গে অস্বাভাবিক উপকরণ আছে কি-না ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করা হয় মনিটরিং সেন্টার থেকে।
চকলেট আপ্যায়ন
ডিআইজি হাবিবুর রহমান বলেন, আমার অফিসে প্রতি দিন ২০০ থেকে ২৫০ জন লোক দেখা করতে আসে। কিন্তু এত লোককে তো আর চা খাওয়ানো সম্ভব না। তাই টেবিলে রাখা বাটিতে চকলেট রাখা। এটা আমার চাকরির শুরু থেকেই করে আসছি। ৯৬ থানায় ডিউটি অফিসারের সামনে চকলেটের বাটি রাখার ব্যাপারে তিনি বলেন, সমস্যা নিয়েই মানুষ থানায় আসে। থানায় ঢোকার পর ডিউটি অফিসার যদি একটি চকলেট দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করেন তাহলে ভুক্তভোগী অনেকটা সহজ হন। তিনি মনখুলে তার অভিযোগ ডিউটি অফিসারকে বলতে পারেন। তবে এতে কী ঘুষ নেওয়া বন্ধ হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘুষ তো কেউ প্রকাশ্যে দেওয়া-নেওয়া করে না। কিন্তু চকলেট দিয়ে একজনকে আপ্যায়ন করার পর ডিউটি অফিসার তার কাছে বকশিস চাইতে গিয়ে কিছুটা হলেও সংকোচ বোধ করবেন।
তিনি আরো বলেন, থানায় সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তির পুরোপুরি অবসান তো শতভাগে আনা যাবে না। যতোটা পারা যায় চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে ৯৬ থানা সিসিটিভির আওতায় আনার পর অনেকেই ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।