শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা একান্ত অপরিহার্য। আর শক্তিশালী বিরোধী দল তখনই তৈরি হয়, যখন দেশের মানুষ প্রস্তুত থাকে। এই শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকিলে কোনো দেশই শক্তিশালী হইতে পারে না। যে কোনো দেশের পত্র-পত্রিকা খুলিলে দেখা যায় সমস্যার অন্ত নাই। বিশেষত আমাদের দেশে রাস্তা নির্মাণ করা হইতেছে; কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্রিজ নাই, ব্রিজ থাকিলেও নাই সংযোগ সড়ক। প্রয়োজনীয় রাস্তা ও ব্রিজ কেন নির্মিত হয় নাই, সেই প্রশ্ন জনগণকেই তুলিতে হইবে। শুধু প্রশাসনের দিকে চাহিয়া থাকিলে চলিবে না। স্থানীয় পর্যায়ে নানা স্তরে আমাদের জনপ্রতিনিধিগণ রহিয়াছেন। একেবারে তৃণমূল ইউনিয়ন পর্যায়ে রহিয়াছেন চেয়ারম্যান-মেম্বারগণ। তাহার পরও সরকারি কাজ ঠিকমতো হয় না। ঠিকাদাররা কাজ ফেলিয়া রাখেন। কাজ ছাড়াই বিল উঠাইয়া নেন অনেক সময়। অনেক ক্ষেত্রে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার কাজ করিবার অভিজ্ঞতা না থাকিলে ঠিকাদারির কাজ পাওয়া যায় না। আর বড় ঠিকাদাররা কাজ পাইয়া তাহা সাবকনট্রাক্টরদের নিকট বিক্রয় করিয়া দেন। এসও হইতে শুরু করিয়া অ্যাডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ারগণ রহিয়াছেন। তাহারা এই সকল অনিয়ম না দেখিলে কে দেখিবেন? কথায় বলে—বেড়ায় খেত খায়। কোর্ট-কাচারিতে গেলে অনেক সময় ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। পুলিশের বিরুদ্ধেও রহিয়াছে এন্তার অভিযোগ। প্রশাসনের সর্বনিম্ন হইতে সর্বোচ্চ পর্যন্ত দুর্বৃত্তায়নের যেই জাল বিস্তৃত, তাহা ছিন্ন করিবেন কে বা কাহারা? এই অবস্থা হইতে উত্তরণে দরকার গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করা। এই সকল প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হইলে আমরা যতই বলি না কেন, দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল গড়িয়া উঠিবার আশা করা অবান্তর।

প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা বলিতে আমরা কী বুঝি? প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করিবার অর্থ হইল আইন ও নিয়মকানুন মানিয়া চলা, কাহারও রক্তচক্ষুকে ভয় না করিয়া নিয়মনীতির প্রতি অটল থাকা। অবশ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও বিদেশে টাকা পাচার প্রসঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে হইকোর্ট বলিয়াছে, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বরতরা সবাই সরকারি কর্মচারী। দায়িত্বে থেকে এই কর্মকর্তারা লুটপাট ও অর্থপাচারের বিষয়টি শনাক্ত না করে খেয়েদেয়ে গাড়ি-বাড়ি বানাবেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থ দেখবেন না, তা হতে পারে না।’ যেইখানে আইনের শাসন নাই, সেইখানে এমনতর কথাও অনেকের নিকট বেমানান মনে হইতে পারে। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী না করা হইলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হইবে না। প্রতিটি সরকারের আমলে জিঘাংসামূলক মামলা-মোকদ্দমা অব্যাহত থাকিলে এই দেশে আইনের শাসন কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হইবে? কীভাবে শক্তিশালী হইবে বিরোধী দল?

প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া শক্তিশালী গণতন্ত্র কল্পনাতীত। এমনকি দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকিলে সংবাদপত্র ও বাক্স্বাধীনতাও শক্তিশালী হয় না। সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলিয়া পরিচিত ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টেও ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত কোনো বিরোধী দল ছিল না। সেই সময় রাজার বিরোধিতা করা, উত্তরাধিকার, পররাষ্ট্রনীতি বা জাতীয় বিষয় লইয়া প্রশ্ন তুলিলে ছিল প্রাণহানির আশঙ্কা। তাহার পর সামগ্রিকভাবে রাজ্য শাসনের বিকল্প হিসাবে রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ঘটে। এই সময় রাজার উত্তরাধিকার প্রশ্নকে, বিশেষত রাজা দ্বিতীয় জেমসের ক্ষমতায় আরোহণকে কেন্দ্র করিয়া সৃষ্ট বিতর্কেই দল হিসাবে টোরি ও হুইগ পার্টির আবির্ভাব ঘটে। জন স্টুয়ার্ট মিল ১৮৫৯ সালে ‘অন লিবার্টি’ বইয়ে লিখিয়াছেন, সুস্থ রাজনীতির জন্য যেমন দরকার স্থিতিশীলতার পক্ষের দল, তেমনি দরকার প্রগতিশীলতার বা সংস্কারের পক্ষের দল’। ইহাতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভুল সংশোধনের পথ অবারিত হয়। তবে এই জন্য সরকারি ও বিরোধী দল উভয়কে হইতে হইবে সহনশীল, আদর্শিক ও দায়িত্বশীল।