সানেমের জরিপ

করোনায় দারিদ্র্য হার বেড়ে ৪২ শতাংশ

করোনাকালীন সময়ে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৪২ শতাংশ। তুলনামূলক বেশি দরিদ্র মানুষের বসবাস রংপুর বিভাগে। করোনার প্রভাবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে করোনার এই সময়ে মাথাপিছু গড় শিক্ষাব্যয় কমলেও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য খাতে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব :সানেমের দেশব্যাপী জরিপের ফলাফল’ শিরোনামে গতকাল শনিবার একটি ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। ওয়েবিনারে আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

জরিপের ফলাফল উপস্থাপনের সময় ড. সেলিম রায়হান বলেন, এই জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোভিড-পূর্ববর্তী সময়ের সঙ্গে কোভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। ২০১৮ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সঙ্গে সানেমের করা জরিপের মধ্যে থেকে ৫ হাজার ৫৭৭টি খানার ওপর এই জরিপটি ফোন কলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দেশব্যাপী এই জরিপটি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়।

জরিপের ফল অনুযায়ী ২০২০ সালের শেষ দিকে দেশের দারিদ্য হার পাওয়া গেছে ৪২ শতাংশ। ২০১৮ সালে জিইডি-সানেমের জরিপে যা ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০১৬ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা জরিপ অনুসারে দারিদ্র্য হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। বিবিএস-এর খানা জরিপ অনুসারে ২০১৬ সালে গ্রামাঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৮ সালের জিইডি সানেম জরিপ অনুসারে যা ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ, করোনাকালীন সময়ে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ আর করোনাকালীন সময়ে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

চরম দারিদ্র্যের হারের (লোয়ার পোভার্টি রেট) ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে বিবিএস এর খানা জরিপ অনুসারে এই হার ছিল জাতীয়ভাবে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ২০২০ সালে মহামারির প্রভাবে এই হার বেড়ে হয়েছে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার এখন ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ। শহরাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ।

২০২০ সালে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বরিশালে ছিল ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ, ঢাকায় ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ, খুলনায় ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ, রংপুরে ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সিলেটে ৩৫ শতাংশ।

প্রাক-কোভিড এবং কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ে অসমতার তুলনা করার জন্য গিনি সহগ ব্যবহার করা হয়েছে। গিনি সহগ ২০১৮ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩১ এবং ২০২০-এ বেড়ে শূন্য দশমিক ৩২ হয়েছে। ২০১৮ এবং ২০২০ সালের মধ্যে মাথাপিছু গড় শিক্ষাব্যয় হ্রাস পেয়েছে। তবে গড় মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয় বেড়েছে, মধ্যম দরিদ্র (৯৭%) এবং অ-দরিদ্র (১০৪%) পরিবারের জন্য এটি সবচেয়ে বেশি। এই গবেষণায় অনলাইন (টিভি, ইন্টারনেট ইত্যাদি) শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও পর্যালোচনা করা হয়। গ্রামাঞ্চলের ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং শহরাঞ্চলের ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে।

মহামারির ফলে কাজ হারানো, পারিশ্রমিক না পাওয়া, কর্মক্ষেত্র বন্ধ হওয়াসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থান-সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কেবল ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবারের দাবি ছিল যে, তাদের সদস্যরা আগের মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পেরেছে। ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার দাবি করেছে যে, কাজ থাকা সত্ত্বেও তাদের আয় হ্রাস পেয়েছে, ৮ দশমিক ৬ শতাংশ দাবি করেছে যে, তারা কাজ হারিয়েছে।

গবেষণায় রেমিট্যান্স আয়ের একটি বৈপরীত্যও তুলে ধরা হয়েছে। ম্যাক্রো-স্তরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেলেও, পারিবারিক পর্যায়ে অভিবাসী সদস্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ৮২ শতাংশ পরিবার দাবি করেছে যে, তারা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স কম পেয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরের মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ দাবি করেছে যে, তারা মহামারির আগে যা পাচ্ছিল তার তুলনায় কম পেয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. এম এম আকাশ বলেন, ‘করোনায় দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে পুনরুদ্ধারের জন্য শিক্ষা খাতকে যত দ্রুত সম্ভব চালু করতে হবে, স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি দিতে হবে, কর্মসংস্থানের পরিবর্তনগুলো স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এই অসাম্য থেকে হয়তো আমরা খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি পাব না। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যে ধরনের উদ্যোগ বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি সেটি আমরা দেখছি না, যদিও করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি এই উদ্যোগগুলো নেওয়া সম্ভব। যে প্রবৃদ্ধির পথে আমরা এগোচ্ছিলাম তা ছিল কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি, কোভিডের প্রভাবে এতে আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যে কর্মসংস্থান হারিয়েছি সেটি পুনরুদ্ধারে এবং নতুন করে আরো কর্মসংস্থান তৈরিতে আগামী বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘গত বছরের চাইতে এবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন কম হয়েছে। অথচ সংকটকালীন সময়ে এটি বেশি হওয়া উচিত ছিল। কারণ সরকারের বিনিয়োগের ওপরই নির্ভর করবে যে, জনগণ কত ভালোভাবে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা করে তোলার প্রয়োজন ছিল, যেন দরিদ্রের হাতে অর্থ যায় এবং সেই অর্থ দিয়ে তারা বাজারে যেয়ে পণ্য কিনতে পারে। প্রণোদনা পর্যাপ্ত নয় তা নিয়ে আগেও আলোচনা করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে যারা কম পেয়েছে বা পায়নি তাদের কথা ভাবতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে প্রণোদনা দেওয়া শুরু হয়েছে, আমাদেরও সেদিকে এগোতে হবে। প্রথম ধাপের ভুলত্রুটিগুলো দ্বিতীয় ধাপে যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটি মাথায় রাখতে হবে।’

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এই জরিপে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে তা হলো, দারিদ্র্যের ভৌগোলিক আওতা ছড়িয়ে পড়েছে, গ্রামেও যে হারে দারিদ্র্য বেড়েছে শহরেও সেই একই হারে বেড়েছে। আবার যেখানে আগে দারিদ্র্য কম ছিল সেখানেও ব্যাপক বেড়েছে, যেখানে বেশি ছিল সেখানেও ব্যাপক বেড়েছে। দারিদ্র্যের বহুমুখী ধারণা, যেমন শিক্ষা চিকিত্সায় প্রভাব, সে বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। শিক্ষায় দারিদ্র্য বেড়েছে, শিক্ষায় ব্যয় কমেছে, বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থায় বেশির ভাগই অংশ নিতে পারছে না।’