একটি জনপ্রিয় বাংলা গান রহিয়াছে—‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়।’ ইহা একটি সান্ত্বনার কথা। সেই যে একটি কবিতায় বলা হইয়াছে—‘মাথার ওপর খাটানো নীল/ বিনে পয়সার তাঁবু।’ এই বিনে পয়সার নীল তাঁবুর নিচেই বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ গৃহহীন মানুষ বসবাস করে। আর তাহাদের মধ্যে গত শনিবার সারা দেশের গৃহহীন, ঠিকানাহীন ও সুবিধাবঞ্চিত ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন পরিবারের নিকট ঘর উপহার দিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘর পাইয়া অনেকেই উচ্ছ্বসিত আনন্দে কাঁদিয়া ফেলিয়াছেন। তাহারা কখনো কল্পনাও করিতে পারেন নাই—তাহাদেরও একদিন এক টুকরা জায়গা ও ঘর হইবে। ইহা যেন এক অভূতপূর্ব স্বপ্নের মতো।
অচিন শূন্যে উড়িয়া চলা একটি পাখিরও নীড় থাকে, কিন্তু গত এক দশকে নদীভাঙনে ৬৮ লক্ষ মানুষ ভিটাছাড়া হইয়াছে। গত বত্সর এই হিসাব দিয়াছে সুইডেনভিত্তিক রাউলওয়ালবার্গ ইনস্টিটিউট ও ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষ খানা আয়ব্যয় জরিপ ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হইতে জানা যায়, প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের বাড়িঘর নাই। আর যেই সকল পরিবারের ঘর আছে, তাহাদের প্রায় ৩৩ শতাংশ একটিমাত্র ঘরে দিন গুজরান করেন। এই তথ্য সর্বশেষ আদমশুমারি হইতে জানা গিয়াছে। ছিন্নমূল এই সকল মানুষের জন্য দেশব্যাপী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বৃহত্ উদ্যোগ দেখা যায় ১৯৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর। সেই সময় ‘আশ্রয়ণ’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়—যাহার মাধ্যমে প্রায় ৩ লক্ষ ভূমিহীন-গৃহহীন-অসহায়-ছিন্নমূল পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। ইহার পর ২০১০ সালে প্রায় আড়াই লক্ষ ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল অসহায় পরিবার পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই সকল প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৭ সাল হইতে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৩ লক্ষ ২০ হাজার ৫২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার পুনর্বাসিত হয়। ইহারও পূর্বে ১৯৮৮ হইতে ’৯০ সাল অবধি সারা দেশে ৫৬৮টি গুচ্ছগ্রাম স্থাপন করিয়া ২১ হাজার ছিন্নমূল ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসিত করিয়াছিল তত্কালীন সরকার। সর্বশেষ গত শনিবার সরকারের ঘোষণা করা মুজিববর্ষের উপহার হিসাবে ৬৯ হাজার ৯০৪টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর তৈরি করিয়া দিয়াছে বাংলাদেশ সরকার। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এক দিনে এত বিপুলসংখ্যক গৃহহীনকে গৃহ প্রদানের উদাহরণ বিশ্বে আর কোথাও নাই। এই কাজে সম্মিলিতভাবে যুক্ত ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগসহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়। পর্যায়ক্রমে আরো অনেকেই ঘর পাইবেন। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে যেই তালিকা করা হইয়াছে সকল মিলাইয়া সেই তালিকায় ৮ লক্ষ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবারের নাম রহিয়াছে। নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকার ছিন্নমূলদের প্রতি গভীর মানবিকতার এক নূতন নজির তৈরি করিল। আমরা ইহার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।
তবে যাহারা ঘর পাইয়াছেন তাহাদের যেন কর্মসংস্থানেরও ন্যূনতম ব্যবস্থা থাকে। কারণ, যাহাদের গৃহ দেওয়া হইল, তাহাদের কর্মসংস্থান যদি একই স্থানে না হয় তাহা হইলে এই উদ্যোগের সুফল সুদূরপ্রসারী হইবে না। কারণ, আমরা দেখিয়াছি, যখন গ্রামে কাজ থাকে না, তখন গরিব মানুষগুলি বাড়িঘর ফেলিয়া শহরে চলিয়া আসেন। এই বাস্তবতা মাথায় রাখিয়া কর্মসংস্থানের ব্যাপারে তাহাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণের সুবিধা এবং প্রশিক্ষণের সুবিধা দেওয়ার কথা জানা গিয়াছে। ইহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হইল ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, ঋণপ্রদান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করিয়া তোলা এবং আয় বৃদ্ধি পায় এমন কার্যক্রম সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা। অর্থাত্ দারিদ্র্য দূরীকরণই মূল লক্ষ্য। কেহ যদি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে গরিব না থাকেন, তাহা হইলে নিজের ঘর তাহারা নিজেরাই নির্মাণ করিয়া লইতে পারিবেন। সুতরাং তাহাদের কর্মযোগ্যতা অনুযায়ী এই জনশক্তিকে কাজে লাগাইতে হইবে।