আমেরিকা। নাম শুনলেই এর শক্তিমত্তার দিকটি বিশ্বের মানুষের সামনে ফুটে ওঠে। ভেসে ওঠে এই দেশের মানুষের উন্নত জীবনের দৃশ্য। বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছরই তার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অনেক দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গি বা চরমপন্থিদের দমনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। কিন্তু সদ্যবিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে সেই আমেরিকার চেহারা যেন অনেকটাই ভিন্ন রূপ নিয়েছে। বিদায়ের আগে তিনি রেখে গেছেন এক নতুন আমেরিকা। সেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন জো বাইডেন। ইউরোপিয়ানরাও মনে করছেন, বাইডেন আমেরিকার নন, ‘নতুন’ আমেকাির প্রেসিডেন্ট। ফলে তার সামনে চ্যালেঞ্জও বেশি।
কেন ‘নতুন’ আমেরিকা?
আমেরিকায় চরমপন্থা আছে এটা হয়তো অনেকের ধারণাই ছিল না। এমনকি সামরিক বাহিনীতেও চরমপন্থা ঢুকে গেছে। এর প্রমাণও পেয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। তাদের অনেককে বরখাস্তও করা হয়েছে। গণতন্ত্রের শীর্ষস্থান কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনা পুরো বিশ্বেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এসব হামলার পেছনে রয়েছে কট্টর জাতীয়তাবাদী ও ট্রাম্পন্থিরা। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দেশীয় চরমপন্থার বিষয়টিতে নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন। গত বুধবার তার শপথের পরই বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি ভবন ও ডেমোক্রেটিক পার্টির অফিসে হামলা চালানো হয়েছে। তারা ব্যানারে লিখেছেন, ‘জো বাইডেন নয়, আমরা প্রতিশোধ নিতে চাই।’ এদের প্রায় সবাই ছিলেন কালো পোশাক ও মুখোশ পরিহিত। এদের অ্যান্টিফা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। ক্যাপিটল হিলে হামলার বিষয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এত নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে কীভাবে হামলার ঘটনা ঘটল, তা নিয়েই বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’ নামের দেশটির বিষয়ে সেই ইউরোপিয়ানদের মনোভাবে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। অধিকাংশ ইউরোপিয়ান জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হওয়াকে ভালো চোখে দেখছেন। কিন্তু তারা এটা মনে করেন না যে, বাইডেন আগের মতো আমেরিকাকে বিশ্বনেতৃত্বের সিংহাসনে বসাতে পারবেন।
অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভাঙন ধরেছে। তাই নিজেদের রক্ষায় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা যায় না। তারা বরং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নিজ দেশের পদ্ধতি এবং জার্মানির সঙ্গে অংশিদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ইউরোপিয়ানরা অর্থনৈতিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কঠোরতার বিষয়েও একমত।
ভৌগোলিক রাজনীতিতেও আমেরিকার দুর্বল অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। বেশির ভাগই মনে করছে, এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনই বেশি শক্তিশালী হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর সংঘাতে ইইউকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করাই সমীচীন হবে বলে মনে করে ইউরোপিয়ানরা। দুই-তৃতীয়াংশ নাগরিক মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো। এসব তথ্য পাওয়া গেছে প্যান-ইউরোপিয়ান সার্ভে থেকে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস ১১টি ইউরোপীয় দেশের ১৫ হাজার মানুষের মধ্যে জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে। গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ডাটা প্রাক্সিজ এবং ইউগভ এই জরিপ চালিয়েছে।
বাইডেনের সামনে বন্ধুর পথ
মার্কিন জনপ্রিয় মিডিয়া সিএনএনে এক বিশ্লেষণে সাংবাদিক স্টিফেন কলিনসন লিখেছেন, বাইডেন ক্ষমতায় এসেই পরিবর্তন করতে শুরু করেছেন। কিন্তু তার সামনে চ্যালেঞ্জ ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। মুখে হয়তো আমেরিকার অনেক পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে নয়। ওয়াশিংটনে আসার পর বাইডেন ৯ জন প্রেসিডেন্টকে দেখেছেন। তিনি তার সেই অভিজ্ঞতা থেকে কাজ করছেন। তিনি জানান দিতে শুরু করেছেন যে, আমেরিকা এখন নতুন পথে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, আমেরিকা রাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। যেখানে আমেরিকার রাজনীতিকদের মধ্যে দেশীয় বিষয়ে কোনো মতবিরোধ দেখা যায়নি, সেখানে দুই দলের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কেবল দেশ নয়, পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বাইডেনকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতিতে যে ধরনের পরিবর্তন এনেছিলেন, তা পরিবর্তনে বেশ বেগ পেতে হবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে। চার বছর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় যে মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্ব বাইডেন দেখেছিলেন, সেখানে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাই তো ব্রিটেনের জনপ্রিয় পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে এক নিবন্ধে রাজনৈতিক বিশ্লেষক গর্ডন ব্রাউন লিখেছেন, বাকি বিশ্বের সহায়তা ছাড়া বাইডেন আমেরিকাকে আবার শীর্ষে তুলতে পারবেন না। তার মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রকে যেমন অন্য দেশের প্রয়োজন, তেমনি অন্য দেশকেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন। গর্ডন লিখেছেন, বাইডেন তার প্রিয় কবি সিমাস হিয়েনির কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় বলেছিলেন, তিনি সমুদ্র পরিমাণ পরিবর্তনের আশা করেন। কিন্তু বিভক্ত আমেরিকায় সেই পরিবর্তন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় আছে। তাই তার প্রথম কাজ হবে আমেরিকাকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং দ্বিতীয় কাজ হলো আমেরিকার একাকিত্ব দূর করা।
বিবিসির প্রধান বৈদেশিক সংবাদদাতা লিস ডুসেট এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, ‘বন্ধুগণ, এখন সময় পরীক্ষার।’ গত বুধবার অভিষেক উপলক্ষ্যে ভাষণে এ কথা বলেছিলেন বাইডেন। চ্যালেঞ্জের তালিকা তিনি শেষ করেন বিশ্বে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে। সেই পরীক্ষার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো আসবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
জো বাইডেনের কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি সামলানোর দায়িত্ব যারা পেয়েছেন, তাদের অনেকেই ওবামা সরকারে ছিলেন। তাদের সময়কালে যেসব সমস্যার সমাধান তারা দিয়ে যেতে পারেননি, সেদিকে নজর দিতে গিয়ে তারা দেখবেন বাস্তবতা গত চার বছরে অনেক বদলে গেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা তারা খাবেন যখন দেখবেন, যেসব নীতি তারাই প্রণয়ন করেছিলেন, তার অনেকগুলো উধাও হয়ে গেছে বা জটিল চেহারা নিয়েছে। কিন্তু অনেকে আবার মনে করছেন, নতুন এই বাস্তবতার মধ্যে সুযোগও তৈরি হয়েছে।