লোকসানের বোঝা কমাতে সরকারি সিদ্ধান্তে রংপুরের শ্যামপুর চিনিকলসহ দেশের ছয়টি চিনিকল ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়ে গেছে অবৈধ কলে আখ মাড়াই করে গুড় তৈরির কাজ। শ্যামপুর চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উত্পাদিত আখ নিয়ে চাষিরা পড়েছেন বিপাকে। আর এ সুযোগে একটি চক্র চাষিদের ভুল বুঝিয়ে চিনিকলের আওতাভুক্ত এলাকায় অবৈধভাবে পাওয়ার ক্রাশার মেশিন (মাড়াইকল) বসিয়ে আখ মাড়াই ও গুড় তৈরি করে যাচ্ছে। অথচ সরকারের নির্দেশনা রয়েছে যে, চিনিকলের আওতাভুক্ত এলাকায় আখ মাড়াই করা যাবে না।
সরকারি বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে দিনরাত সমান তালে চলছে আখ মাড়াই করে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ। শ্যামপুর চিনিকলের আওতাভুক্ত এলাকায় অন্তত শতাধিক মাড়াই মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। অনেকেই নতুন করে পাওয়ার ক্রাশার মেশিন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শনিবার রংপুরের বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার নিভৃত পল্লি এলাকা ও যমুনেশ্বরী নদীর চর ঘুরে দেখা গেছে, চাষিরা জয়পুরহাট চিনিকলের জন্য আখ না দিয়ে অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন।
জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের নাটারাম স্কুলপাড়ায় আখ মাড়াইকল বসানো হয়েছে। সেখানে ব্যবসায়ী আলতাব হোসেন কৃষকের কাছ থেকে আখ কিনে মেশিনে মাড়াই করছিলেন। তিনি বলেন, শ্যামপুর চিনিকল বন্ধ তাই আখ কাজে লাগাচ্ছি। রংপুরের বাজারে আখের গুড়ের চাহিদা বেশি। প্রতি কেজি গুড় পাইকারি ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার হাসিয়া গ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে আখ মাড়াই ও গুড় তৈরির কাজ। যমুনেশ্বরী নদীর তীরে মতিয়ার রহমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, শ্যামপুর চিনিকল বন্ধ সেই জন্য মেশিন কিনে এনেছি। নিজের জমির আখ মাড়াই করে গুড় তৈরি করছি। মতিয়ার জানান, শুধু তিনি নন, তার আশপাশে কমপক্ষে অর্ধশত নতুন ক্রাশার মেশিন স্থাপন করে আখ মাড়াই করা হচ্ছে। ৮০০ কেজি আখে ৫৬ কেজি গুড় হয়। প্রতি দিন কমপক্ষে ছয় মণ গুড় তৈরি করা সম্ভব।
শ্যামপুর সুগারমিল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বুলু আমীন বলেন, ‘হঠাত্ চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। বন্ধ চিনিকল চালুর দাবিতে তারা আন্দোলন করছেন। চাষিরা প্রয়োজনে আখ পুড়িয়ে ফেলবে তবু জয়পুরহাট চিনিকলে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাছাড়া অনেক চাষি দীর্ঘসূত্রতার কারণে জয়পুরহাটে আখ দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এ কারণে অনেকেই স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা মাড়াইকলে আখ বিক্রি করে দিচ্ছেন।শ্যামপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দীলিপ কুমার সরকার সাংবাদিকদের জানান, শ্যামপুর চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর আওতাভুক্ত এলাকায় উত্পাদিত আখ জয়পুরহাট চিনিকলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ২ জানুয়ারি মিলগেটে আখ নেওয়া শুরু হয়। চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার ২০০ একর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছে। শ্যামপুর চিনিকলের আওতায় প্রায় ৭ হাজার আখ চাষি রয়েছেন। আখ চাষে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে চলতি মৌসুমের জন্য ৩ কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এ ফসল চাষ করতে সময় লাগে ১৪ থেকে ১৬ মাস। চাষিদের আখ চাষে আগ্রহ বাড়াতে বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে একরপ্রতি ২৬ কুইন্টাল বীজআখ সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও ১১০ কেজি টিএসপি, ৯৭ কেজি এমওপি সার দেওয়া হয়। মূলত জমি ছাড়া সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় চাষিদের। চিনিকলের আওতায় ৬৫ ইউনিটে আখ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন। শ্যামপুর জোনের আওতায় অবৈধ পাওয়ার ক্রাশার ছিল ৭৪টি। কিন্তু এবারে মিল বন্ধ থাকায় অন্তত দেড় শতাধিক পাওয়ার ক্রাশার মেশিন স্থাপন করে চলছে মাড়াই। শ্যামপুর চিনিকলের এমডি আরো জানান, শ্যামপুর জোনের উত্পাদিত সমুদয় আখ সংগ্রহ করে জয়পুরহাট চিনিকলে পাঠানো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক চাষি মনে করছেন আর আখ নেওয়া হবে না। এ জন্য অনেকে অবৈধভাবে আখ মাড়াই করে গুড় তৈরি করছেন। দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।