হেমন্তের সোনাধানে মাঠ ভরে আছে। হিমি বাতাস ঢেউ তুলে নেচে বেড়ায় সোনালি ধানের শীষ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। ধানখেতের ভেতর মহা আনন্দে ঘুরে বেড়ায় ইকরি চিকরি আর তাঁদের মা-বাবা। ধান প্রায় পেকে উঠেছে। এখন কেবল অপেক্ষা কখন কৃষকেরা ধান কাটবে। নতুন ধানের গন্ধে ম-ম করছে চারপাশ। অপেক্ষার পালা শেষ হলো। মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম লেগে গেল। ইঁদুর পরিবারও আনন্দে আত্মহারা। বর্ষার শুরুর দিকেই জন্ম হয়েছে ইঁদুরছানা ইকরি আর চিকরির। ক’মাসে পুঁচকে ইঁদুরছানা ইকরি চিকরি বেশ বড় হয়ে উঠেছে। ক’দিন ধরে মা ইঁদুর আর বাবা ইঁদুর মিলে ইকরি-চিকরিকে ছোট ছোট কাজ শেখাচ্ছে। আত্মরক্ষার কৌশলও শেখাচ্ছে। কৃষকরা কাস্তে হাতে খচখচ করে ধান কাটছে আর মনের আনন্দে গান গাইছে। পাশেই ধানখেতের আলের মাঝ বরাবর গর্ত করে ইকরি-চিকরির মা-বাবা ওদের নিয়ে বসবাস করে। তাঁদের পাশেই আরেকটি গর্তে ইকরি-চিকরির পিঁপড়ে বন্ধু তুলতুলিদের বাড়ি। ইকরি-চিকরি নতুন ধানের মিষ্টি চাল কুট কুট করে খাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে। তাই মা-বাবা ইকরি-চিকরিকে গর্তে রেখে ধান আনতে বাইরে গেছে। ইকরি-চিকরি গুটিসুটি মেরে গর্তে বসে আছে। হঠাত্ ইকরির কানে কৃষকদের কথা বলার শব্দ এল। একজন কৃষক আরেক জন কৃষকের সাথে নবান্ন উত্সব নিয়ে কথা বলছিলেন। ধান ঘরে তোলার পর কৃষকদের ঘরে ঘরে না-কি নবান্ন উত্সব হবে। মেয়ে, জামাই-সহ আত্মীয়-স্বজন আর প্রতিবেশীদের দাওয়াত করবেন। ইকরি-চিকরি বুঝতে পারছিল না নবান্ন জিনিসটা আসলে কী? তাই মা ইঁদুর ঘরে ফিরতেই আগ্রহের স্বরে ইকরি-চিকরি মাকে প্রশ্ন করে, মা, নবান্ন কী? মা তো হেসেই কুটিকুটি। কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে, মা বলল, নবান্ন কী জানিস না বেটা। কৃষকদের নতুন ধান ঘরে তোলার পর যে উত্সব হয় সেটাই নবান্ন উত্সব। কৃষকদের ঘরে ঘরে এসময় নতুন ধানের চাল দিয়ে বিভিন্ন রকমের পিঠা, পায়েস, ক্ষীর রান্না করা হয়। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদেরও দাওয়াত করে খাওয়ানো হয়।
মায়ের কথা শেষ না হতেই চিকরি বলল, তাহলে আমাদের ঘরেও তো নতুন ধান তোলা হবে। আমাদের নবান্ন উত্সব হবে না? মা বললেন, আমাদেরও নবান্ন উত্সব হবে। আগে ঘরে ধান তুলে নিই। চিকরি বলল, মা, নবান্ন উত্সবে আমার পিঁপড়ে বন্ধু তুলতুলি ও তার পরিবারের সবাইকে দাওয়াত করতে হবে কিন্তু। মা বলল, ঠিক আছে তা-ই হবে। ইকরি বলল, তাহলে আমার পাখিবন্ধু টুকটুকিকেও দাওয়াত করতে হবে। মা বলল, অবশ্যই দাওয়াত করব।
কৃষকদের সাথে সাথে অগ্রহায়ণ মাসে ইঁদুর আর পিঁপড়েদেরও বেশ ব্যস্ত সময় কাটে। ওদের জন্য এটাই উপযুক্ত সময়, সারা বছরের জন্য কিছু খাবার সঞ্চয় করে রাখার। ইকরি-চিকরির জীবনে এটাই প্রথম নবান্ন উত্সব। মা-বাবার সাথে ইকরি-চিকরিও খাবার সংগ্রহ করবে এবার। সারাদিন কৃষকেরা দল বেঁধে ধানগাছ কেটে আঁটি বেঁধে সারি সারি মাঠ জুড়ে বিছিয়ে রাখে। সন্ধ্যে নেমে এলেই তারা বাড়ি ফিরে যায়। রাতভর ইঁদুরেরা ধানগাছের আঁটিগুলোর নিচে কুটকুট করে মাটি কেটে কেটে ইয়া লম্বা সুড়ঙ্গ তৈরি করে। একদম তাদের থাকার জায়গা পর্যন্ত। তাদের থাকার ঘরের একপাশেই তাদের সঞ্চিত খাদ্যগুলো একসাথে জমা করে রাখে। গর্ত করা শেষ হলেই শুরু হয় ধানের শীষ থেকে ধান কেটে কেটে নিয়ে জমিয়ে রাখার কাজ। পুঁচকে ইঁদুর ইকরি-চিকরিকে মা-বাবা সব শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরি করে নিয়েছে এতদিনে। কীভাবে গর্ত করতে হয়, কীভাবে গর্তের ভেতরে ধান নিয়ে নিয়ে জমিয়ে রাখতে হয়। ইকরি-চিকরি সব শিখে নিয়েছে। নতুন ধানের মিষ্টি চাল কুটকুট করে ইকরি-চিকরি খায় আর মনের আনন্দে লাফায়। মা বলে, সাবধানে থাকিস। বেশি লাফালাফি করতে গিয়ে কৃষকের হাতে ধরা পড়িস না যেন। কৃষকের হাতে ধরা পড়লে অকালে প্রাণ হারাবি বাপু। কৃষকদের ধান তোলা শেষ। মাঠে এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু ধান পড়ে আছে। পাখিরা দলবেঁধে ধান কুড়িয়ে খেতে আসে। পিঁপড়েদেরও ইয়া লম্বা লম্বা লাইন লেগেছে। সবার মুখে মুখেই ধান। বেশি শীত পড়লে পিঁপড়েরাও বাইরে বের হতে পারে না। তাই তাদেরও খাদ্য সঞ্চয় করার এটাই উপযুক্ত সময়। সবার ঘরে ঘরেই নবান্ন উত্সব লেগেছে। ইকরি-চিকরিদের ঘরভরতি মেহমান। তুলতুলিদের পরিবার আর টুকটুকিদের পরিবারের সবাই এসেছে ইকরি-চিকরিদের সাথে নবান্ন উত্সবে যোগ দিতে।