চসিকে ৫৩ কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী শতাধিক

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আজ বুধবার। নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে ৩৯টি সাধারণ ও ১৪টি মহিলা ওয়ার্ডসহ মোট ৫৩টি কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এই ৫৩টি কাউন্সিলর পদে দল সমর্থিত একক প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এবার কাউন্সিলর পদে মহিবুল হাসান চৌধুরীর ১৭ জন অনুসারী দলীয় সমর্থন পেয়েছেন, আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারীরা পেয়েছেন আটটি ওয়ার্ডে।

এদিকে, দলীয় পদ হারানোর হুঁশিয়ারিতেও অনড় অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে দলীয় কোনো নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তাকে বিদ্রোহী বলা হয়।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনড় বিদ্রোহীরা। এছাড়া অতীতে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেও অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার সাহস পেয়েছেন। কিছু কিছু জায়গায় সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা যতই কঠোর অবস্থানের কথা জানাচ্ছেন, ততই যেন আরো অনড় অবস্থানে যাচ্ছেন বিদ্রোহীরা। তাদের এক কথা—দল যত শাস্তিই দিক, নির্বাচনের মাঠে আছি। বেশির ভাগ বিদ্রোহী প্রার্থীর অভিযোগ—‘মনোনয়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়নি। জেলার নেতারা প্রার্থী নিয়ে সঠিক তথ্য কেন্দ্রে পাঠাননি। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন যোগ্যরা।’

আরও পড়ুন: চসিক নির্বাচনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর

চট্টগ্রামে সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামীলীগ মনোনীত একক প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী। ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে একটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। অন্য একটি প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় সেটিতে ভোটগ্রহণ হবে পরে। তাই মোট ৩৯টি সাধারণ এবং ১৪টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ভোটগ্রহণ হবে আজ। গতবারের কাউন্সিলরদের মধ্যে সাধারণ ও নারী আসনের ১৭ জন এবার দলের সমর্থন পাননি। তাদের মধ্যে ১২ জন নির্বাচন করছেন। মোট ৩২টি ওয়ার্ডেই আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের বিপরীতে এক বা একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। শুরু থেকে বিদ্রোহীদের সরে যেতে নানা হুমকিধমকি, দল সমর্থিত প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ আর সবশেষ দুয়েক দিনের মধ্যেই ‘সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার হুঁশিয়ারিতেও কাজ হয়নি। তবে শেষ মুহূর্তে দলের সিনিয়র নেতারা বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী ইস্যুতে অনেকটা নীরব ও নমনীয়। বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে দলটির কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা এখনো আসেনি। তবে দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রায় সবাই নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর পক্ষে প্রচারে মাঠে ছিলেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একদিকে সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, অন্যদিকে আ জ ম নাছির উদ্দীন আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের কাছে। এই সময়ে মোট পাঁচ বার সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে। চার বারই দলের প্রার্থী ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। সর্বশেষ ২০১৫ সালের নির্বাচনে তার পরিবর্তে দলের মনোনয়ন পেয়ে মেয়র হন আ জ ম নাছির উদ্দীন। এবার নাছিরের জায়গায় মনোনয়ন পেয়েছেন মহিউদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত এম রেজাউল করিম চৌধুরী। এই একটি চমক ছাড়া ভোটের রাজনীতিতে ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগের পুরোনো দ্বন্দ্বের কথাই আলোচনায় আসছে। ২০১৭ সালে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার অনুসারীদের নেতৃত্বে চলে আসেন ছেলে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। অন্য পক্ষে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির তার অনুসারীদের নিয়ে পৃথক অবস্থান ধরে রেখেছেন।

আরও ‍পড়ুন: চট্টগ্রামে ভোটে সহিংসতার আশঙ্কা ইসি মাহবুবের

স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিদ্রোহী ও তাদের মদতদাতাদেরও কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রামে গিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ বলেছিলেন, ‘দুয়েক দিনের মধ্যে কেন্দ্র থেকে বিদ্রোহীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু এখনো পর্যন্ত কারোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

বিদ্রোহী ও দল সমর্থিত প্রার্থীদের সংঘর্ষে দুই জন নিহত

চট্টগ্রামে বিদ্রোহীদের মধ্যে বেশির ভাগের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় মামলাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামে নির্বাচনি সহিংসতায় যে দুই জন নিহত হয়েছেন, তাও আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিরোধ থেকেই।

ইত্তেফাক/এএএম