পাগলকাহিনি

আমাদের দেশের রাজনীতিতে ইদানীং একে অপরকে ‘পাগল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার একটা প্রবণতা চলছে। প্রতিপক্ষের সমালোচনা করে যেমন কোনো কোনো রাজনীতিবিদ অপর পক্ষের দ্বারা ‘পাগল’ অভিধা পাচ্ছেন, আবার নিজ দলের নেতাদের সমালোচনা করেও কেউ কেউ ‘পাগল’ হিসেবে অভিহিত হচ্ছেন। রাজনীতিতে কেউ একটু বেশি সমালোচনা করলে বিরুদ্ধপক্ষ কর্তৃক ‘পাগল’ উপাধি পাওয়া অবশ্য আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এটা অত্যন্ত চালাকিমাখানো একটি রাজনৈতিক কৌশল। কেননা একবার যদি কাউকে আপনি ‘পাগল’ হিসেবে একটা ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আপনার আর কোনো সম্মানহানির ভয় নেই। সে আপনাকে নিয়ে যত কথাই বলুক না কেন, আপনি মুচকি হেসে বলতে পারবেন : ‘আরে ও তো একটা পাগল। আর জানেনই তো, পাগলে কী না বলে!’

তিনটি অক্ষর দিয়ে তৈরি ‘পাগল’ শব্দটি আসলে বড়ই রহস্যময়। এ শব্দের অভিব্যক্তি বহু বিচিত্র। এটি যেমন ব্যক্তির মানসিক অস্তিত্বের এক বিপর্যস্ত অবস্থাকে নির্দেশ করে, আবার অতিসচেতন অবস্থাকেও নির্দেশ করে। অর্থাত্ যার মাথাটি ফাঁকা তাকে যেমন বোঝায়, আবার যার মাথায় সাধারণের তুলনায় মালমসলা একটু বেশি তাদেরকেও বোঝায়। অনেক সৃষ্টিশীল খেয়ালি মানুষ এ শব্দকে নামের আগে খেতাব হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে প্রকাশ করেন। কখনো অপমানজনক গালি হিসেবে এর ব্যবহার হয়। আবার এ শব্দ দিয়ে পরম মমতারও প্রকাশ ঘটে।

আমাদের সমাজে ‘পাগল’ কথাটি প্রথম ব্যবহূত হয় পারিবারিক পরিমণ্ডলে। মায়ের কাছে প্রতিটি সন্তানই পাগল। আমার ‘পাগল ছেলে’ বলে প্রত্যেক মা-ই নিজ সন্তানের প্রতি তার চূড়ান্ত মমত্বের প্রকাশ ঘটান। আমরা অনেকেই প্রথম ‘পাগল’ খেতাবটি অর্জন করি মা কিংবা নানি-দাদির মতো স্নেহময়ী কারো কাছ থেকে। যখন ফুটবল বা ক্রিকেটপ্রেমী কোনো ব্যক্তিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়, ‘লোকটা এ বয়সেও খেলাপাগল’ তখন পাগল শব্দটির ব্যঞ্জনা অন্য রকম হয়। আবার দাম্পত্য জীবনের খুনসুটিতে যখন বলা হয়, ‘যা, কী পাগলামি শুরু করেছ!’ তখন তা হয়ে ওঠে ভিন্ন এক অনুভূতির প্রকাশ। এ রকমভাবে ‘গানের পাগল’, ‘বইয়ের পাগল’, ‘ক্ষমতার পাগল’, ‘বউপাগল’ বা ‘অর্থের পাগল’—নানা বিচিত্র পাগল দিয়ে আমাদের সমাজটা পরিপূর্ণ।

তবে পাগলের রকমফের আছে। পাগলামিরও নানা ধরন আছে। প্রতিভাবান খেয়ালি মানুষের সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডও সাধারণের কাছে ‘পাগলামি’ বলেই পরিচিতি পায়। জুলভার্নের ক্যাপ্টেন নিমো, সত্যজিত্ রায়ের প্রফেসর শঙ্কু বা হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলীও এক ধরনের পাগল বলেই সাধারণ্যে আদৃত। সাধারণ পাগলরা সমাজের জন্য খুব বেশি ক্ষতিকর নয়। সাধারণ একজন পাগলের সর্বোচ্চ মনের বাসনা হলো ট্রাফিক কন্ট্রোল করা। তবে চরম পাগল, যাকে আমরা উন্মাদ বলি, তা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক।

চেহারা দেখে পাগল চেনা যায় না। আচরণ ও কথাবার্তায় বোঝা যায় না, কে পাগল আর কে উন্মাদ। ফল দেখে যেমন গাছ চেনা যায়, তেমনি আচরণ ও কথায় পাগল ও উন্মাদের পরিচয় পাওয়া যায়। পাগলের পাল্লায় পড়লে মারাত্মক কোনো সমস্যা হয় না। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কমবেশি পাগলামির প্রবণতা আছে। কেউ একটু বেশি পাগল, কেউ একটু কম। কিন্তু অবাক ব্যাপার হচ্ছে, কাউকে সরাসরি পাগল বললে সে ভয়ানক খেপে যায়। সেক্ষেত্রে ঠ্যাঙানি খাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পাগলদের এজাতীয় আচরণের কোনো বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পাগলকে কেন ‘মাথা গন্ডগোল’ না বলে পাগল বলা হয়, তা নিয়েও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা কোনো মহামহিম ভাষাবিজ্ঞানীর কাছে পাওয়া যায় না। সুনীতি-সুকুমার-শহীদুল্লাহ্র মতো প্রাতঃস্মরণীয়রাও এ ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে যাননি।

আমাদের সমাজে নানা কিসিমের পাগল দেখা যায়। কেউ জাতপাগল, কেউ শৌখিন পাগল, কেউ ভেকধারী পাগল, কেউ-বা ভাবের পাগল। কিছু কিছু আদর্শবান ব্যক্তি আছেন, যারা সমাজে ‘পাগল’ হিসেবে খ্যাত। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও খ্যাতি নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানে কতজন নির্ভরযোগ্য পাগল আছে তার ওপর। আগের দিনে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক পাগল শিক্ষক ছিলেন। তাদের নাওয়া-খাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না। ঠিক ছিল না পোশাক-পরিচ্ছদের। তারা দিনরাত মত্ত থাকতেন পড়া ও পড়ানো নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জি সি দেবের মতো ‘পাগল’রা পড়াতেন। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনামও ছিল। এখন তেমন পাগল আর দেখা যায় না। শিক্ষাঙ্গনে, প্রশাসনে, মন্ত্রিসভায়, সরকারে তেমন কোনো পাগল নেই। তাই সবখানে এখন চরম দুরবস্থা।

এখন বরং চারদিকে উন্মাদেরই আধিক্য, তাদেরই জয়জয়কার। উন্মাদের কথায় ও কাজে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ে, সর্বনাশের ধারা সূচিত হয়। আমাদের সমাজের বেশির ভাগ জায়গায় বর্তমানে উন্মাদের কায়কারবার চলছে এবং সাধারণ পাগলদের সংখ্যা কমলেও অর্থ ও ক্ষমতার পাগলদের দাপট চলছে। বর্তমানে যে যত টাকাওয়ালা, সে তত ক্ষমতাশালী। যে যত বড় চোর, লম্পট, তার গলা এখানে তত চড়া। টাকার পাগলরা আবার কথাতেও বেশ দক্ষ হয়। এরটা মেরে, ওরটা কেড়ে নানা ফিকিরে এরা টাকার মালিক হন। ভোগবিলাসে মত্ত থাকেন। কিন্তু মানুষকে দেবার বেলায় এরা মহা কৃপণ। তেমনই এক কৃপণের কাহিনি মনে পড়ছে।

আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া এক ব্যক্তি বিশাল আলিশান বাড়ি তৈরি করেছেন। ভদ্রলোকের অর্থ ও প্রতিপত্তির কোনো শেষ নেই। কিন্তু কোথাও কোনো সমাজকল্যাণমূলক কাজে এক পয়সাও দান করেন না।

একবার কাছাকাছি একটা ক্লাবের ছেলেপুলেরা ভাবল, ওনাকে গিয়ে ধরবে। ক্লাবের ব্যাডমিন্টন মাঠটা পরিচর্যা করবার জন্য কিছু টাকা আদায় করবে। সেইমতো একদিন তারা গেল ওই ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়ি।

ভদ্রলোক বাইরে আসতেই ক্লাবের একটি ছেলে বলল, ‘স্যার, আপনার তো বিশাল নামডাক। অনেক প্রতিপত্তি শুনেছি। আমরা একটু এলাম, আমাদের ক্লাবে কিছু টাকা চাঁদা দেন যদি, ভালো হয়।’

ধনাঢ্য ভদ্রলোক একটুও বিচলিত না হয়ে বললেন, ‘তোমরা শুধু বাইরেটাই দেখো। ভেতরের খবর কিছু তো জানো না। জানো, আমার একমাত্র ভাই, ক্যানসারে শয্যাশায়ী। প্রতি সপ্তাহে তার চিকিত্সার খরচ তিন লক্ষ টাকা। জানো তোমরা ?’

ক্লাবের ছেলেরা একটু হকচকিয়ে গেল। বাস্তবিকই তারা এত খবর জানত না। তবু একজন আমতা-আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ভদ্রলোক আরো খাদে গলা নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘কী আর বলব তোমাদের। আমার দুলাভাই। দুবছর আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকে ওদের সংসার দেখার মতোই কেউ নেই। আপার একটা ছেলে আছে বারো বছরের, একটা মেয়ে আট বছরের। বলতে গেলে একরকম অনাথ ওরা আজ। কে আছে ওদের আমি ছাড়া? তারপর আমার নিজের শ্বশুর। পুরো প্যারালাইজড। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। তার চিকিত্সার জন্য লাগে লাখ লাখ টাকা।’

ছেলেরা মানে মানে সরে যেতে পারলে তখন বাঁচে। কিন্তু ভদ্রলোক আরো বলছিলেন, ‘আমার মেজো ফুপু। দুটো কিডনিই তার অকেজো। কত টাকা যে পানির মতো খরচ হয় ওনার চিকিত্সায়। অতি কষ্টে বেঁচে আছেন তিনি। খবর রাখো এসবের?’

ছেলেদের লিডার এবার বলল, ‘ঠিক আছে, স্যার আমরা সত্যিই এত কিছু জানতাম না। ঠিক আছে, আমরা তাহলে আসি আজকে।’

‘হ্যাঁ, যাও যাও।’ ধানাঢ্য ভদ্রলোক ফাইনাল স্পিচ দিলেন, ‘এদেরকেই যখন আমি এক পয়সাও দিই না, তোমরা কী করে আশা করো?’

পুনশ্চ :

একবার হাইকোর্টের মোড়ে বসে এক পাগল হাতে বেশ বড় একটা পাথর নিয়ে সারা দিন ধরে নিজের মাথায় ঠকাস-ঠকাস করে মারে আর ব্যথায় আর্তনাদ করতে থাকে। তাকে যখন জিগ্যেস করা হলো, কী ব্যাপার ভাই, আপনি নিজেই নিজেরে মারেন, আবার নিজেই চিল্লান, ঘটনা তো বুঝলাম না!

পাগল একটু মুচকি হেসে বলল, বুঝবেন, একটু কাছে আসেন।

প্রশ্নকর্তা ঘাবড়ে গেল, মারবে নাকি রে বাবা?

মনোভাব বুঝতে পেরে পাগল বলল, না রে ভাই, মারুম না, কানে কানে কমু।

আশ্বস্ত হয়ে পাগলের মুখের কাছে কান নেবার পর ফিসফিস করে পাগল বলল, ভাই রে, মারা যখন বন্ধ রাখি, তখন কী যে আরাম লাগে!

n লেখক :রম্যরচয়িতা