মানব ও অর্থ পাচারের দায়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলকে চার বছর সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে কুয়েতের আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার বা ৫৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কুয়েতের ফৌজদারি আদালত এই রায় ঘোষণা করে। ভিনদেশি একজন সংসদ সদস্যের দণ্ডিত হওয়ার এ খবর কুয়েতের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম ফলাও করে প্রকাশ ও প্রচার করে। এ দণ্ড ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো সংসদ সদস্য প্রথম বারের মতো আদালত কর্তৃক অভিযুক্ত হলেন। কুয়েতের ফৌজদারি আদালতের বিচারক আবদুল্লাহ আল ওসমান এ রায় ঘোষণা করেন। এ রায়ের সংবাদ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশের পর জনগণ সমালোচনা মুখর হয়। স্বস্তি ফেরে প্রতারণার শিকার অভিবাসন কর্মীদের মধ্যে।
এমপি পাপুল ছাড়াও কুয়েতের তিন নাগরিককেও দণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এরা সবাই পাপুলকে সহায়তার অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন। কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মাজেন আল জারাহ ও আরো দুই কুয়েতি কর্মকর্তাকেও চার বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে একই আদালত। ঐ দুই কর্মকর্তা ছিলেন পাপুলের বিভিন্ন কাজের মধ্যস্থতাকারী ও এজেন্ট। তাদের প্রত্যেককে ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া পাপুলকাণ্ডে নাম উঠে আসে কুয়েতের দুই জন সংসদ সদস্য সাদুন হাম্মাদ আল-ওতাইবি ও সালাহ আবদুলরেদা খুরশিদের। তবে তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন বিচারক।
গত ৬ জুন মানব পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পাপুলকে মুশরিফ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে কুয়েতের সিআইডি সদস্যরা। কুয়েতের আইন অনুযায়ী, নাগরিকরা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশিদের স্পন্সর করতে পারেন এই শর্তে যে, তারা তাদের জন্য কাজ করবেন। তবে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও অনেকে বিদেশি শ্রমিকদের কাফালা বা বসবাসের অনুমতি দেওয়ার নামে ব্যবসা করে থাকেন। এর ফলে বিদেশি শ্রমিকরা কুয়েতে কাজ খুঁজতে আসেন, কিন্তু মূল স্পন্সরের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা থেকেই যায়।
মানব পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে আটক পাপুলসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, মানব পাচার, ঘুষ লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগ আনেন কুয়েতের সরকারি কৌঁসুলিরা। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পাপুলের আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেন বিচারক।
এর আগে কয়েক দফায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পাপুলকে কুয়েতের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। আর কয়েক দফায় তার জামিন আবেদনও বাতিল হয়। তদন্ত চলাকালে পাপুল ও তার কোম্পানি মারাফি কুয়েতিয়ার ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় ১৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা জব্দ করে কুয়েতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তদন্ত কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, এমপি পাপুল কুয়েতের ব্যাংক হিসাব থেকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে লাখ লাখ দিনার (১ দিনার প্রায় ২৭৭ টাকা) পাঠিয়েছেন। কর্মকর্তারা আরো জানতে পারেন, ভিসা নবায়ন, মানব পাচার ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের অভিযোগ ওঠার পর কুয়েতে থেকে নিজের ব্যবসা গোটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পাপুল।
তার বিরুদ্ধে তদন্তের সময় আরো অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে মানব পাচার ও অর্থ পাচারে পাপুলকে বিভিন্ন সময় সহায়তা করেছেন কুয়েতের এমন কয়েক জন প্রভাবশালী রাজনীতিক ও কর্মকর্তার নাম বেরিয়ে আসে। কুয়েতের এক জন আমলাসহ তিন কর্মকর্তাকে ২১ লাখ দিনার (বাংলাদেশি টাকা ৫৭ কোটি ৫৪ লাখ) ঘুষ দিয়েছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন পাপুল। তাদের মধ্যে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মাজেন আল জারাহ। সব মিলিয়ে তদন্তের সময় অভিযুক্ত হিসেবে ১৩ জনের নাম উঠে আসে। তাদের মধ্য থেকে চার জনকে তদন্তকালে বাদ দেওয়া হয়।
জানা যায়, ১৯৮৯ সালে একটি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার (শ্রমিকদের তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে চাকরি নিয়ে কুয়েত যান পাপুল। তখন তিনি ছিলেন অনেকটা নিঃস্ব। ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত দখলের কারণে তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও কুয়েতে যান। এরপর তিনি একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া শুরু করেন। এই আদম পাচার ব্যবসা করে অল্প দিনেই বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক বনে যান পাপুল। এরপর ২০১৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এমপি হওয়ার পর সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম। কুয়েতে মামলার পর বাংলাদেশেও পাপুলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।
পাপুলের বিচার চেয়েছিলেন নির্যাতিত কর্মীরা
পাপুলকে আটকের পর কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশনের কাছে সাক্ষ্য দেন ১২ বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী। তাদের মধ্যে ১১ কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে কুয়েত সরকার। সাক্ষ্যে তারা বলেন, পাপুল ভালো বেতনের লোভ দেখিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে কুয়েতে নিয়ে গেছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে অনেকেই কাজ পাননি। কেউ কাজ পেলেও বেতন পেয়েছেন অনেক কম। দিনে তাদের কাজ করতে হয়েছে ১৬ ঘণ্টা। বাইরে কোথাও কাজ করতে গেলে পাপুলের লোকজনকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হতো। নইলে তাদের ওপর চলত নির্যাতন।