দুদকের ভুল বিচারের মামলার সাজার রায় বাতিল করে দিয়েছে হাইকোর্ট। নোয়াখালীর বিশেষ আদালতের দেওয়া ঐ রায় বাতিলের পাশাপাশি দণ্ডিত নিরপরাধ কামরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারে জারিকৃত পরোয়ানাও প্রত্যাহারের আদেশ দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে এসএসসির সনদ জালিয়াতির মামলাটি নতুন করে তদন্তে দুদককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসংক্রান্ত রিট মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় দেয়।
রায়ে ভুল তদন্তের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. মাহফুজ ইকবালের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। হাইকোর্ট বলেছে, কিছু কিছু লোক আছে, জায়গা (প্রতিষ্ঠান) আছে, যেখানে মানুষের প্রত্যাশা হলো তারা ফেরেশতার মতো থাকবে। কিন্তু এ রকম দু-একটি ভুলের কারণে গোটা প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে, যা কাম্য নয়।
প্রসঙ্গত, নোয়াখালী সদরের পশ্চিম রাজারামপুরের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম ১৯৯৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে সনদ (মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র) জালিয়াতি করে ভর্তি হন মাইজদী কলেজে। এ ঘটনায় তত্কালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো ২০০৩ সালে মামলা করে। মামলার এজাহারে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে নিরপরাধ কামরুলকে আসামি করা হয়। আর ঠিকানার স্থানে পশ্চিম রাজারামপুরের স্থলে পূর্ব রাজারামপুর গ্রামের নাম উল্লেখ করা হয়। পূর্ব-পশ্চিমের এই ঠিকানার ভুলে সেই দুদককাণ্ডের শুরু, যা ১০ বছর ধরে চলা তদন্তেও উদ্ঘাটিত হয়নি। ২০১৩ সালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর আসামি পলাতক থাকায় জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। ঐ পরোয়ানা তামিল করতে গিয়ে আসামির ভুল ঠিকানার বিষয়টি পুলিশ উদ্ঘাটন করে। হুলিয়া ও ক্রোকি তামিল প্রতিবেদনে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, আসামি মো. কামরুল ইসলামের ঠিকানায় গ্রাম হিসেবে ‘পূর্ব রাজারামপুরের’ বিষয়টি সঠিক নয়। আসামির প্রকৃত ঠিকানা হচ্ছে পশ্চিম রাজারামপুর, আবুল খায়ের দারোগাবাড়ি, ৫ নম্বর ওয়ার্ড, হরিনারায়ণপুর বাজারের পূর্ব পাশে। এই ঠিকানায় উপস্থিত হয়ে জানা যায়, আসামি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তাদের একান্নবর্তী পরিবার হওয়ায় এবং নিজস্ব কোনো অস্থাবর সম্পত্তি না থাকায় ক্রোক করা সম্ভব হলো না। এই প্রতিবেদন আমলে না নিয়েই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে পূর্ব রাজারামপুরের বাসিন্দা নিরপরাধ কামরুলকে তিনটি ধারায় পাঁচ বছর করে মোট ১৫ বছরের জেল এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন নোয়াখালীর বিশেষ জজ শিরীন কবিতা আখতার। এই রায়ের পর কামরুলকে গ্রেপ্তারে গত বছর তার বাড়িতে যায় পুলিশ। পুলিশের গ্রেপ্তার ও হয়রানি এড়াতে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। ঐ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে হলফনামা দিয়ে দুদক বলে, তদন্তে ভুল হয়েছে। ক্ষমা করে দিন।
গতকাল শুনানির একপর্যায়ে হাইকোর্ট বলেছে, ‘তদন্তে ভুলের বিষয়টি উদ্ঘাটনের পর আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম দুদক দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ব্যবস্থা না নিয়ে বলছে ভুল করেছে, মাফ করে দেন। এভাবে যদি চলে, তাহলে এ ধরনের ঘটনা কি রোধ হবে?’ দুদকের কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান বলেন, বিষয়টি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হাইকোর্ট বলে, ‘তদন্ত কর্মকর্তার কাছে কী ব্যাখ্যা চেয়েছেন? কোর্ট কিছু জানতে চাইলেই আপনারা আমলাতান্ত্রিক জবাব দেন।’ দুদকের কৌঁসুলি বলেন, ‘জাহালমের মামলা আমরা কনটেস্ট করেছি। কিন্তু এখানে স্বীকার করেছি ভুল হয়েছে। কোর্টের কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা কমিশনের কাছে মাফ পাবেন না।’
রিটকারীর কৌঁসুলি মিনহাজুল হক চৌধুরী বলেন, ঠিকানা পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় প্রকৃত আসামির পরিবর্তে নির্দোষ ব্যক্তি দণ্ডিত হয়েছেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ রায় দেয়। রায়ে বলা হয়, নিরপরাধ কামরুল যদি ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করেন, তাহলে যেন কমিশন সেটা বিবেচনা করে সেটাই আদালতের প্রত্যাশা।