স্বাভাবিক হোক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

রাজনীতি এবং সেশনজট মুক্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এর প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমিও এই গৌরবের অংশীদার। কিন্তু এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে যা চলছে তা উদ্বেগজনক। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এটি ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে। তিনজন শিক্ষকের চাকরিচ্যুতি এবং দুজন শিক্ষার্থীর বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি। দুজন শিক্ষার্থী কিছু দাবি নিয়ে আন্দোলন করছিল। স্থানীয় দৈনিক খুলনায় প্রকাশ, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। দাবিগুলো ছিল—১. বেতন কমানো, ২. আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, ৩. চিকিত্সাব্যবস্থা উন্নতকরণ, ৪. অগ্রাধিকারভিত্তিতে অবকাঠামো নির্মাণ এবং ৫. ছাত্র বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।

সাদা চোখে দেখলে দাবিগুলো যৌক্তিক। ছাত্ররা এই ধরনের দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতেই পারে। আমাদের দেশে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন আন্দোলনের নজির রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তবুদ্ধি চর্চার পীঠস্থান। তাই সেখানে বাক স্বাধীনতা থাকবে না, এমনটি হতে পারে না। আমাদের দেশে স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর সব যুগেই যে কোনো ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে ছাত্ররাই প্রথম আন্দোলন শুরু করে। ছাত্র আন্দোলনে বাংলাদেশের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে সমর্থনদানের অভিযোগে একইসঙ্গে তিনজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়। শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে শিক্ষকদের সমর্থনও আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়।

এখন বিবেচনা করা যেতে পারে—খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল, না সহিংস ছিল। পত্রিকা মারফত এবং ব্যক্তিগত খোঁজখবর নিয়ে যতটুকু জেনেছি, এই আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিক। সহিংস কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সম্পদেরও অনিষ্ট করেনি। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এতটা কঠোর কেন হলেন? অহিংস আন্দোলনের জন্য কোনো ছাত্র বহিষ্কার বা তাতে সমর্থনদানের জন্য কোনো শিক্ষক চাকরিচ্যুত হতে পারেন—তা মানা যাচ্ছে না। পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে, ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। এটা একেবারেই কাম্য নয়। সেক্ষেত্রে শাস্তি তাদের প্রাপ্য। তবে লঘু পাপে গুরু দণ্ড কাম্য নয়। চাকরিচ্যুত শিক্ষক তিনজন যদি প্রতিষ্ঠানবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তবে ভিন্ন কথা—সেটাও জনসম্মুখে আসা উচিত।

উদ্ভুত পরিস্থিতি সমাধানে একটা ভালো উদ্যোগ চোখে পড়েছিল ছাত্রদের অনশন শুরুর দ্বিতীয় দিনে। খুলনার অভিভাবক, নগর পিতা আবদুল খালেক তালুকদার ছুটে গিয়েছিলেন অনশনরত ছাত্রদের কাছে। তিনি বিবদমান উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। তিনি একজন প্রকৃত অভিভাবকের মতোই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো সেই উদ্যোগের কোনো শুভ ফল দেখতে না পেয়ে হতাশ হচ্ছি।

আমরা চাই স্বার্থান্বেষী কোনো মহল যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগ না পায়। সমস্যা গভীরে পৌঁছানোর আগেই সমাধান একান্ত কাম্য। রাজনীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো মহল যেন রাজনীতি করার সুযোগ না পায়। অনশনরত ছাত্র দুজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ করছেন শিক্ষকদের সঙ্গে তারা যে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে তার জন্য লিখিতভাবে দুঃখ বা ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাঁরা তাদের বহিষ্কারাদেশের বিষয়টি বিবেচনা করবেন। মেয়র মহোদয়ও একই আহ্বান জানিয়েছেন। শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা চাওয়াতে অগৌরবের কিছু নেই। অনশনরত ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং তাদের সুস্থতা কামনা করে অনুরোধ করছি, মাননীয় মেয়র মহোদয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিলে যদি সমস্যার সমাধান হয়, তবে তাদের তাই করা উচিত। প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার দায়িত্ব তাদেরও।

খুলনা