যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর জোসেফ রবিনেট বাইডেন (জো বাইডেন)-এর এই উক্তিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে—‘আমি দেশ সেবা করতে এসেছি, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়াতে নয়। যদি ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানোর ইচ্ছা থাকত তবে ব্যবসায়ী হতাম, রাজনীতিবিদ নয়। রাজনীতি হলো বিলিয়ে দেওয়ার জায়গা, বিলিয়নিয়ার হওয়ার নয়। ব্যবসায় মুনাফা থাকে, রাজনীতিতে থাকে শুধু সেবা। এই সেবাটাই হলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মুনাফা।’ এ কথায় তিনি প্রকৃত রাজনীতিবিদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। রাজনীতিবিদ হবেন একজন দেশপ্রেমিক, দেশ ও মানুষের সেবক, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে দেশ ও মানুষকে ভালোবাসা ও সেবা করা। জো বাইডেন প্রকাশ করেছেন একজন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর মধ্যে পার্থক্য।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানেন কীভাবে ব্যর্থতা, দুঃখ-কষ্টকে জয় করতে হয়, হাসিমুখে বরণ করে নিতে হয়। সাফল্যের জন্য কতটুকু ধৈর্য ধরতে হয়, ওপরে ওঠার জন্য কতটুকু সাধনা ও পরিশ্রম করতে হয়, কত সময় দিতে হয় ও লেগে থাকতে হয়। তাঁর জীবনে এসেছে দুঃখ-কষ্ট, কিন্তু আশাহত হননি, ভেঙে পড়েননি। সাধনা করে ব্যর্থতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে সক্ষম হয়েছেন, অবশেষে জয়ী হয়েছেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তিনি হারিয়েছেন তাঁর প্রথম স্ত্রী নেইলিয়া হান্টারকে এবং এক বছরের কন্যাসন্তানকে। তাঁর এই স্ত্রী ও কন্যাসন্তান এক দুর্ঘটনায় মারা যান। শুধু তাই নয়, তাঁর প্রিয় পুত্র বু বাইডেনকেও হারিয়েছেন। তাঁর ছেলে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ব্যর্থতাও এসেছে। ১৯৮৮ এবং ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন চেয়েও পাননি। কিন্তু তিনি আশা হারাননি কিংবা বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করতেও দ্বিধা করেননি। তিনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। অবশেষে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়েছেন।
জো বাইডেন ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কান্ট্রি কাউন্সিলর, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ২৯ বছর বয়সে আমেরিকার ডেলাওয়্যার রাজ্য থেকে সর্বকনিষ্ট সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ থেকে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর, ২০০৯ থেকে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
জো বাইডেনের জীবন থেকে জানা যায়—কীভাবে সত্, নির্লোভ হয়ে জীবন যাপন করতে হয়। ৩৮ বছর সিনেটর হিসেবে ছিলেন, ছিলেন আট বছর ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি আমেরিকার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়েও ছিলেন নির্লোভ ও সত্। ডেলাওয়্যার রাজ্য থেকে সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন আর সে রাজ্য থেকে ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে ট্রেনে করে আসতেন আর কাজ শেষে আবার ট্রেনেই বাড়ি ফিরে যেতেন। তিনি সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত। তাঁর প্রথম সন্তান বু বাইডেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সময় তিনি বাড়ি বিক্রি করে চিকিত্সা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। কারণ তিনি ভেবেছিলেন, এই দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে পারে কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করতেও পারে। বাড়ি বিক্রির কথা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জানতে পেরে তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। বাড়ি বিক্রি থেকে তাঁকে রক্ষা করেন। কিন্তু তাঁর ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শিখিয়েছেন, ৭৭ বছর বয়সেও কিভাবে তেজি ঘোড়ার মতো দৌড়াতে হয়, লড়াই করে জিততে হয়। ইচ্ছাকে কীভাবে বাস্তবে রূপ দিতে হয়, পূরণ করতে হয়, উদ্যমী ও পরিশ্রমী হতে হয়। তাই তিনি অভিষেকের পর থেকেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। সময়কে কাজে লাগাচ্ছেন। তিনি আমাদের জন্য এক আদর্শ ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ঢাকা