রবীন ভাবুক
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সব মানুষকে যেমন এক কাতারে নিয়ে এসেছে, তেমনি তথ্যের ধারণাকে করেছে সুসংবদ্ধ। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির কিছু বিষয়— সামাজিক প্রেক্ষাপটকে করে তুলছে আতঙ্কগ্রস্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষকে যুক্ত করে ফেলেছে। সবাই মিলে যেন একটি ইন্টারনেট পরিবার। তবে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ পরিস্থিতিও।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ছে উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মাঝে। লাইকি, টিকটক, উইচ্যাটসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মাধ্যমের যথেচ্ছ ব্যবহার এই শ্রেণির একটি বড় অংশকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। আজকাল বাবা-মায়েরাও এতে সন্তানদের উত্সাহিত করছেন, এমনকি তাঁরা স্বপ্রণোদিত হয়ে অংশও নিচ্ছেন।
বিকৃত অঙ্গভঙ্গি, অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ এমনকি বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে ভাষাকে বিকৃত করারও প্রয়াস লক্ষণীয় এইসব সোশ্যাল মাধ্যমে। টিকটক, লাইকির মতো সোশ্যাল মাধ্যমগুলোর ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। শুধু তাই নয়, এই মাধ্যমগুলো ব্যবহারে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য এবং আদর্শগত বৈশিষ্ট্যও চোখে পড়ছে না।
উঠতি বয়সি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে নিজেদের সামর্থ্য ও যোগ্যতা প্রমাণের একটা তাড়না থাকে। সেইসঙ্গে নিজেকে রাতারাতি সুপরিচিত করতেও যে কোনো একটি মাধ্যম বেছে নেয়। টিকটক, লাইকির মতো মাধ্যমগুলোই তখন সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে ওঠে। এতে শিক্ষণীয় বা সৃজনশীল বার্তার চেয়ে বিকৃত বার্তার প্রচলন বেশি। বলতে গেলে ইতিবাচক কোনো বিষয়ই থাকে না। হরহামেশাই শোনা যায়, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্মের ছেলেমেয়েরা মারপিট ও অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হচ্ছে। এদের ঘিরেই গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। আবার তাদের কোমলতাকেই ব্যবহার করছে স্থানীয় কিছু ক্যাডার। রাতারাতি পরিচিত হওয়া এই কিশোর-কিশোরীরাও নিজেদের মনোজগতের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হয়ে ওঠে বেপরোয়া।
তাই ভবিষ্যত্ প্রজন্ম অতলে তলিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের সামাজিক মানুষদের করণীয় রয়েছে অনেক কিছু। বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, এসব মাধ্যমের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। সেইসঙ্গে প্রতিটা সামাজিক প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য ও কার্যকারিতা চিহ্নিত করতে হবে। বয়সভেদে এইসব মাধ্যম ব্যবহারকে নিশ্চিত করাও হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ। শুধু সরকার ভাবলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। কিশোর সন্তান-ভাই-বোন কোথায় কী করছে, কাদের সঙ্গে মিশছে সবকিছুর খোঁজ রাখতে হবে। পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা করতে হবে। নিজে এসব সামাজিক মাধ্যমের ইতিবাচক-নেতিবাচক বিষয় জেনে ছোটদেরও সেই বিষয়ে অবগত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এসব বিষয়ে তথ্যগত ধারণা দিতে হবে। মৌলিক শিষ্টাচার বিষয়ে শিক্ষা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকেই নিজ নিজ জায়গায় মৌলিক মূল্যবোধ গঠনে অংশগ্রহণ করতে হবে।
ঢাকা