মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)
ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
আইনস্টাইনের গল্প শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু আকাশ আর ঘুমোতে পারল না। তার কেবলই মনে হতে লাগল নোবেল পুরস্কারের বৈশিষ্ট্যটা তাহলে কী রকম! এত বড় একটা অর্জন আপেক্ষিকতত্ত্ব এবং যুগান্তকারী সমীকরণ E=mc2 দিয়েও যাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া যাচ্ছে না, দিতে হচ্ছে আলোক তড়িিক্রয়ার জন্য। আলোক তড়িত্ ক্রিয়াটা আসলে কী? এ নিয়ে তার চিন্তা মাথায় এসে ভর করল। মামা বলেছেন আলো থেকে তড়িত্ উত্পন্ন হয়। কিন্তু কীভাবে হয়, তড়িত্ তো হচ্ছে ইলেকট্রনের প্রভাব-স্থির তড়িত্ আলোচনা করতে গিয়ে একদিন আনজুম আন্টি বলেছিলেন। তাহলে আলো পড়লে কীভাবে ইলেকট্রন প্রভাব বিস্তার করে-এ নিয়েই তার চিন্তা। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, ঠিক নেই। ঘুম থেকে উঠেও এই একই চিন্তা। একটা টর্চ নিয়ে সে কতক্ষণ পরপরই বিভিন্ন বস্তুর ওপর আলো ফেলছে, আর টেস্টার ছুঁইয়ে দেখছে বিদ্যুত্ উত্পন্ন হচ্ছে কিনা। কিন্তু তার প্রচেষ্টা সফল হচ্ছে না। কিছুতেই আলো থেকে বিদ্যুত্ উত্পন্ন করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলো-মামা অফিস থেকে এলে এ নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
নীলকান্তবাবু অফিস থেকে ফেরার পর ফ্রেশ হয়ে চা খেতে বসলে আকাশ আলোক তড়িত্ ক্রিয়ার গল্প শুনতে মামাকে গিয়ে ধরল। কমলা চা দিতে দিতে বললেন-তুমি কাল রাতে কীসের গল্প শুনিয়েছ, এখন সকাল থেকে আকাশের খাওয়া নেই দাওয়া নেই আলো থেকে তড়িত্ উত্পন্ন করবে।
আকাশ একটু লজ্জা পেলো, আর ভাবল, রাতেও যে এ নিয়ে চিন্তা করে ঘুমোতে পারেনি-মামি এটি টের পেয়ে গেলেন কি-না।
নীলকান্তবাবু বললেন-যে কোনও আলো যে কোনও বস্তুতে ফেললে তো তড়িত্ উত্পন্ন হবে না।
আকাশ মন দিয়ে শুনছে। এর মধ্যে সীমা, কণিকা, চন্দ্রা, বিন্দু, রেখা, অণু এরাও এসে বসেছে। কমলা বললেন-দাঁড়াও আমি মুড়ি চানাচুর সরিষার তেল দিয়ে মেখে দিচ্ছি।
নীলকান্তবাবু বললেন-দাও। সাথে পিঁয়াজ, কাচামরিচ আর আদাও দিও।
আকাশের দিকে মুখ করে বললেন-নির্দিষ্ট কম্পাংকের আলো বিশেষ ব্যবস্থায় ধাতবপৃষ্ঠে ফেলতে হবে, তবেই ইলেকট্রন মুক্ত হবে এবং তড়িত্ উত্পন্ন হবে।
বিশেষ ব্যবস্থাটি কী? বলল আকাশ।
বিশেষ ব্যবস্থাটি হলো একটি বায়ুশূন্য কোয়ার্টজ নলে দুটি ধাতব পাত অ্যানোড ও ক্যাথোড লাগানো হয়। ক্যাথোডটি ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্ত এবং অ্যানোডটি ঋণাত্মক প্রান্তের সাথে লাগানো থাকে। নির্দিষ্ট কম্পাংকের আলোকরশ্মি আনোডে আপতিত হলে ইলেকট্রন মুক্ত হয়ে যাবে এবং ক্যাথোডে পৌঁছালে তড়িত্ উত্পন্ন হবে। এই তড়িত্ একটি মিলি অ্যামিটারের সাহায্যে পরিমাপ করা যাবে। পাত দুটির মধ্যে বিভব পার্থক্য বাড়াতে থাকলে তড়িত্ প্রবাহও একটা নির্দিষ্ট মান পর্যন্ত বাড়তে থাকবে। তড়িত্প্রবাহের এই মানকে সম্পৃক্তি প্রবাহ (Saturation Current) বলা হয়।
অণু বলল-কিন্তু অ্যানোডকে ব্যাটারির ধনাত্মক পাতের সাথে যুক্ত করলে কী হবে?
তাহলে ইলেকট্রনগুলো অ্যানোডে ফিরে আসবে, ক্যাথোডে পৌঁছাতে পারবে না। এই অবস্থায় বিভব বাড়াতে থাকলে আলোক তড়িত্ প্রবাহ ধীরে ধীরে কমতে থাকবে এবং এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাবে। যে বিভবের জন্য বন্ধ হয়ে গেল, তাকে নিবৃত্তি বিভব বা প্রতিরোধ বিভব (Stopping Potentail) বলা হয়।
সীমা বলল-না, না, উল্টাপাল্টা সংযুক্ত করার দরকার নেই, যদি অ্যানোডে নিগেটিভ আর ক্যাথোডে পজিটিভ কানেকশনই ঠিক রাখি আর আলোর তীব্রতা বা কম্পাংক বাড়াতে থাকি, তাহলে কী হবে?
নীলকান্তবাবু বললেন-তাহলে তড়িত্ প্রবাহের মান বৃদ্ধি পাবে।
আকাশ অনেকটা বুঝেছে। সে বলল-মামা অ্যানোডে কী ধাতু ব্যবহার করতে হবে?
যেমন ধর সোডিয়াম, পটাসিয়াম, সিজিয়াম ইত্যাদি ক্ষারধর্মী পদার্থ।
আকাশ আবার বলল-সব পদার্থেই কি একই কম্পাংকের আলো ফেলতে হবে?
না, না, বললেন নীলকান্তবাবু। যে পদার্থের বন্ধনশক্তি বেশি, সেই পদার্থে বেশি কম্পাংকের আলো ফেলতে হবে।
বন্ধনশক্তিটা যেন কী? বলল কণিকা।
বন্ধনশক্তি হচ্ছে কোনও পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ভেঙ্গে এর মধ্যস্থ কণাগুলোকে পরস্পরের প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য নিউক্লিয়াসে যে পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করতে হয়, অথবা কণাগুলোকে একত্রিত করে একটি নিউক্লিয়াস গঠন করতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়, সেই শক্তি।
পরের অংশ আগামীকাল