নিরাময় কেন্দ্রের অরাজকতা

বর্তমানে সমাজে মাদকাসক্তি এক সর্বনাশা ব্যাধিরূপে স্বীকৃত। এই সমস্যা কেবল আমাদের দেশেই নহে, বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। দেশে মাদকাসক্তি নির্মূলের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠিয়াছে। প্রশ্ন হইল, এই সকল প্রতিষ্ঠান কি মাদকাসক্তি নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা পালন করিতে পারিতেছে? মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, রাজধানীসহ সমগ্র দেশে ৩৫১টি বৈধ মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রহিয়াছে, যাহার মধ্যে সরকারি চারটি। রাজধানীতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা ১০৩টি। সমগ্র দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অন্তত দেড় হাজার। বেসরকারিভাবে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স প্রদান করিয়া থাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, যাহার জন্য অন্তত ১২টি শর্ত পূরণ করিতে হয়। লাইসেন্স পাইবার পূর্বশর্ত—সার্বক্ষণিক একাধিক চিকিত্সক, নার্স, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্যাথলজি, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স ও চিত্তবিনোদন কেন্দ্র থাকা। মাদকাসক্তদের চিকিত্সার জন্য নিরাময় কেন্দ্রে বিশেষায়িত ব্যবস্থা ও চিকিত্সা সরঞ্জামও প্রয়োজন। মাদকাসক্ত ব্যক্তির আসক্তির ধরন নির্ধারণ করিয়া সেই অনুযায়ী ঔষধ এবং থেরাপির সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমে রোগীকে সারাইয়া তোলা হয়; কিন্তু বাস্তবে ৯৮ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই সকল ব্যবস্থা বিধিবিধান মানিয়া চলে না। অভিযোগ রহিয়াছে, অধিকাংশ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে রোগীদের সুস্থ করিয়া তোলার পরিবর্তে অপচিকিত্সার নৈরাজ্য বিস্তার করিয়া থাকে। নিরাময় কেন্দ্রগুলিতে রোগীদের উপর অমানবিক নির্যাতন-অত্যাচার যেন কালচারে পরিণত হইয়াছে। এমনকি নির্যাতন করিবার জন্য মারধরে বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মী বা বাউন্সার নিয়োগ করিয়া থাকে অনেক নিরাময় কেন্দ্র! নিরাময় কেন্দ্রগুলির বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রহিয়াছে—তাহারা রোগী ও তাহাদের স্বজনদের জিম্মি করিয়া মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করিয়া থাকে। অবৈধভাবে গড়িয়া উঠা নিরাময় কেন্দ্রগুলির মধ্যে কিছু কিছু কেন্দ্রে চিকিত্সার নামে দেহব্যবসা ও মাদক ব্যবসা চলিতেছে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। অনুমোদন কিংবা লাইসেন্স না থাকিলেও এই সকল প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে গড়িয়া উঠে।

সকলের জ্ঞাতসারে এই সকল বেআইনি কর্মকাণ্ড চলিয়া আসিলেও যাহাদের বিষয়গুলি দেখিবার কথা, তাহারা কী করিয়া থাকেন? মাঠপর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলির উপর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নজরদারি নাই বলিলেই চলে। বিভিন্ন সময়ে নামকাওয়াস্তে অনুসন্ধান পরিচালনা করিয়া তদন্ত প্রতিবেদন জমা করা হয়; কিন্তু সেই সকল প্রতিবেদন শুধু ফাইলবন্দি থাকা ছাড়া কার্যত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। যথাযথ যাচাইবাছাই ছাড়াই ঘুষের বিনিময়ে যাহাকে-তাহাকে লাইসেন্স প্রদান করা হইয়া থাকে। ইহার পাশাপাশি রাজনৈতিক তদিবরে মহল্লার মাস্তান কিংবা প্রভাবশালীরা লাইসেন্স পাইয়া থাকে।

মাদকাসক্ত রোগীদের চিকিত্সা অন্য রোগীদের চিকিত্সা হইতে আলাদা। চিকিত্সাকালে অনেক সময় মানসিক ভারসাম্য হারাইয়া ফালায় কোনো কোনো রোগী। রোগীদের উপসর্গ অনুযায়ী ঔষধের পাশাপাশি সাইকোসোশ্যাল, সাইকোরিলিজিয়াস পদ্ধতিতে পরামর্শ, কাউনসেলিং ও থেরাপিসহ বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিত্সা প্রদান করিবার কথা। পরিতাপের বিষয় হইল, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন নিরাময় কেন্দ্রে মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ দূরে থাকুক, সাধারণ নার্স কিংবা ডাক্তারও থাকেন না। ইহার ফলে নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সুস্থ করিয়া সমাজের মূলধারায় ফিরাইয়া দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হইতেছে না। সরকারি সংশি­ষ্ট দপ্তরগুলির উদাসীনতা, যথাযথ নজরদারির অভাবে নিরাময় কেন্দ্রগুলিতে অনাচার-নৈরাজ্য প্রতিনিয়ত বাড়িয়াই চলিয়াছে। মাদক সমস্যার বহুমুখিতা আর বহুমাত্রিকতার কারণে সরকারি-বেসরকারি, বৈধ-অবৈধ মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলিতে পর্যাপ্ত নজরদারি ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ বিশেষ প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে।