নীতিনির্ধারকদের ভাবতে বলছি

প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই শিক্ষা নামক শব্দের সুশীতল সুরভি সুবাসিত করেছে যুগের আঙিনা। তাইতো প্রজ্ঞাপীড়িত সময়ের আঁতুরঘরে বন্দি থেকেও মানুষ দূরদূরান্তে ছুটে গিয়েছে জ্ঞানার্জনের জন্য। কারণ, শিক্ষা মানে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জন। আর দক্ষ জনবল যখন উপযুক্ত জ্ঞান প্রয়োগে কাজ করে তখন যে কোনো জাতির উন্নতি কেউ দাবিয়ে কিংবা আটকে রাখতে পারে না। জ্ঞানার্জন যে কোনোভাবেই হতে পারে; কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকে শিক্ষা বলা হয়। যা প্রতিটি ভঙ্গুর জাতিকে জীর্ণ আবরণের খোলস থেকে টেনেহিঁচড়ে মেলে ধরে মুক্ত বাতাসে। আর চাঁদনি মন্দায়ও সুধার ঝরনা জুড়ে প্রবাহিত করে কাঁচা আলতামাখানো মনোরম দ্বিপ্রহর। তাইতো শিক্ষাগ্রহণ শেষে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে দ্বিজ (দ্বিতীয় জন্ম) হিসেবে। অর্থাত্ মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীর আলোয় একজন মানুষের জন্ম যতটা প্রাকৃতিকভাবে সর্বজনবিদিত, ততটাই শিক্ষার আলোয় আলোকিত একজন মানুষ হিসেবে তার বিচরণ প্রশংসনীয়।

বাংলায় শিক্ষা শব্দটির উত্পত্তি সংস্কৃত ‘শাস’ ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। আর ইংরেজিতে (ব্যাকরণগতভাবে) ‘এডুকেশন’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ এডুকেয়ার বা এডুকাতুম থেকে। যার অর্থ বের করে আনা অর্থাত্ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা বা বিকশিত করা। আর এই যে শিক্ষা, এর রয়েছে সুবিশাল পরিচালনব্যবস্থা, যাকে আমরা সহজে শিক্ষাব্যবস্থা বলি। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই রয়েছে নির্দিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা। আর বাঙালির হাজার বছরের শৃঙ্খলমুক্তির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের আহ্বানে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশেরও রয়েছে সুনির্দিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষানীতি। সেই সুবাদে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার কিংবা উন্নয়নে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এযাবত্কালে প্রায় ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’সহ আরো ছয়টি কমিশন/কমিটি রিপোর্ট ঘোষিত হয়। ১. বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন (ড. কুদরাত-এ-খুদা) রিপোর্ট ১৯৭৪, ২. অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি (কাজী জাফর-আবদুল বাতেন প্রণীত) ১৯৭৯, ৩. মজিদখান কমিশন রিপোর্ট ১৯৮৩, ৪. মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ১৯৮৭, ৫. জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ ও ৬. জাতীয় শিক্ষা কমিশন (মনিরুজ্জামান মিয়া) প্রতিবেদন ২০০৩। করোনাকালীন বৈশ্বিক ক্রান্তি শেষেও নতুন শিক্ষানীতির বাতাস বইতে চলেছে। তবে বাঙালির ত্যাগ, আন্দোলন, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার ফসল স্বার্বভৌম বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার অগ্নিপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেন সবসময়ই রয়ে গিয়েছেন প্রজন্মের শিক্ষার কাছে অধরা। তাইতো বিগত সাতটি শিক্ষানীতির কোনোটিতেই বঙ্গবন্ধুকে প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কোনো শিক্ষানীতি নির্ধারিত হয়নি। কখনো বলা হয়নি ‘মুজিবপাঠ’-এর কথা। উলটো ৭৫-পরবর্তী সামরিক স্বৈরাচারী সরকারসমূহ তা বাস্তবায়ন না করে, যতটা বিতর্কিত ততটাই খণ্ডিত কিছু প্রতিবেদন কিংবা সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে শিক্ষাঙ্গন ও সুশীল সমাজের বৈধতা পাওয়ার এক ব্যর্থ প্রয়াস হিসেবে। সেইসঙ্গে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন ও পরিমার্জনের নামে রাজনৈতিক সরকারগুলোর মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটে চলেছে যারপরনাই।

মজার বিষয় হলো—ইতিপূর্বে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা তাদের মতো করে শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করেছে; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসীন থাকাকালীনও যে দুটো ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ (২০০০ এবং ২০১০) প্রণয়ন হয়েছে, সেখানেও নীতিনির্ধারকগণের ইচ্ছার সমাবেশ ঘটলেও ‘মুজিবপাঠ’ বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কিছু বলা হয়নি কিংবা কেউ কিছুই বলেন নি। হয়তো বঙ্গবন্ধু অর্থাত্ শেখ মুজিব যে কেবল ব্যক্তি নয়, স্বমহিমায় বিশ্বের বুকে স্বতন্ত্র বিষয় হয়ে উঠেছেন তা কারও বোধগম্যের অবকাশ হয়নি তখন পর্যন্ত! তবে ইদানীংকালে বঙ্গবন্ধুর জীবনীকে খণ্ডিতভাবে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির তোড়জোড় খুব একটা মন্দ নয়; কিন্তু আমার দাবি অর্থাত্ কথাটি ভিন্ন। আমি বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষার সব পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। কেবল তাই-ই নয়, কেরানি বাদে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষার গুণমানোন্নয়নে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার সততা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, কমিউনিকেশন স্কিল, টিম বিল্ডিং, ক্রিটিক্যাল থিংকিং, প্রবলেম সলভিং অর্থাত্ বিভিন্ন সফট স্কিলসহ সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং আর্টস অ্যান্ড ম্যাথস-এর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। যেখানে আমরা পাচ্ছি—কৃষি, পরিবেশ, শারীরিক শিক্ষা, চারু-কারুকলা, আইসিটির মতো বিষয়, সেখানে বাঙালি জাতীয়তাবোধ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বিশ্ববন্ধু—বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের তাত্পর্য তুলে ধরে কেবল তার জীবনী উপস্থাপন নয়, প্রথম শ্রেণি থেকে না হলেও তৃতীয় শ্রেণি থেকে আর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত না হলেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ‘মুজিবপাঠ’ নামে (৫০ কিংবা ১০০ নম্বরের পরীক্ষার) বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করে আইন অর্থাত্ শিক্ষানীতি প্রণয়ন আমাদের পিতা হারানোর দায় থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেবে প্রজন্মের কাছে। কারণ বাঙালি জাতি, বাঙালি জাতীয়তাবোধ, বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালির ইতিহাস, বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বিজয়, মানবিকতা, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, শিক্ষা, নেতৃত্ব, সাহস, কৌশল, ত্যাগ, কারাবরণ, সহনশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতার মতো বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে জানতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘মুজিবপাঠ’ প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। আমার বিশ্বাস, শিক্ষাব্যবস্থায় ‘মুজিবপাঠ’ প্রণয়নের মাধ্যমে দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি করার পাশাপাশি বাঙালি জাতীয়তাবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী প্রকৃত মানুষ তৈরি হবে নিঃসন্দেহে!

n লেখক : কথাসাহিত্যিক ও নারীনেত্রী