নর ও নারী এ দুয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয় মানব সমাজ। মূলত, মানব সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে নর ও নারী উভয়ে। তাই মানব জীবনে উভয়ের গুরুত্ব অনেক ব্যাপক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সমাজ জীবনে এক জন নর/পুরুষ যেভাবে মূল্যায়িত হয় তেমনি এক জন নারী নানাভাবে নানা কারণে হয় বড় অবহেলিত ও নির্যাতনের শিকার অর্থাত্ অবমূল্যায়ন করা হয় নারীকে প্রতি পদে পদে।
নারীর অবমূল্যায়নটা শুরু কিন্তু পরিবার থেকেই হয়। আর সেটা শৈশব থেকে হয়। যেমন মেয়ে শিশু হলে নানা রং-বেরঙের পুতুল আর হাঁড়িপাতিল দেওয়া হয় আর ছেলে শিশুর বেলায় বন্দুক, পিস্তল, গাড়ি ইত্যাদি দেওয়া হয় খেলার জন্য। বর্তমানে আমেরিকার একটা খেলনা কোম্পানি যার নাম Toys ‘R’ এই কোম্পানি বিক্রয়ের সুবিধার জন্য বাজারকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা—১. বয়েজ ওয়ার্ল্ড ২.গার্লস ওয়ার্ল্ড। বয়েজ ওয়ার্ল্ডে ছেলেদের খেলনা ও গার্লস ওয়ার্ল্ডে মেয়েদের খেলনা বিক্রি করা হয়। সূক্ষ্মভাবে ভেবে দেখুন, এরকম আলাদা করা কি খুবই দরকার ছিল? এরকম আলাদা না করলে কি বাচ্চাদের সঠিক সামাজিকীকরণ হয় না?
এরপর বিবাহিত মেয়েদের কথা বলি, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কিছু পুরুষ ব্যতীত প্রায় সব পুরুষ চায় না তাদের স্ত্রীরা পড়াশোনা করুক/চাকরি করুক। তাছাড়াও হিজাব/বোরকা পরতে বাধ্য করে, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার করতে বাধ্য করে, কারণে অকারণে তালাক প্রদানে/পুনঃবিবাহে বাধ্য করে, স্ত্রীর অমতে/ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করতে চায় ইত্যাদি ইত্যাদি কাহিনি দেখা যায়।
এবার দেখা যাক, গণমাধ্যমে নারীদের কেমন অবস্থা! গণমাধ্যমের কাজ হলো সারাবিশ্বের সংস্কৃতিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এখানেও সূক্ষ্মভাবে অবমূল্যায়ন করা হয় নারীকে। পণ্যের বিজ্ঞাপনে পণ্যের মতোই ব্যবহার করা হয় নারীকে। বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী যেমন—সাবান, ক্রিম, খাবার, মোবাইল, নেটওয়ার্ক, নিত্যব্যবহার্য জিনিস এমনকি গাড়ির ক্ষেত্রে নারীকে তুলে ধরা হয় পণ্যের চেয়েও আকর্ষণীয় পণ্যসামগ্রী হিসেবে। এবার ভাবুন একটা বিষয়, ছোটবেলায় যে মেয়েদের খেলার জন্য খেলনা হিসেবে গাড়ি দেওয়া হয় না, সেই মেয়েদের ব্যবহার করা হচ্ছে গাড়ির বিজ্ঞাপনের কাজে।
যাতায়াতের কথা একটু না বলে পারলাম না আর। একটা কমন কথা প্রায় শুনে থাকি আমরা। সমান অধিকার দাবি করেন, তাহলে যানবাহনের ক্ষেত্রে অসমান কেন? আমরা বলি না আমাদের জন্য আলাদা কিছু করতে। শুধু গাড়িতে আমাদের কোনো হয়রানি করবেন না। দেখবেন আমরাও আপনাদের মতো করে পথ পাড়ি দিতে পারব। আপনারা জানেন সব নারীই নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্তান গর্ভে ধারণ করে ও জন্ম দেয়। তার ক্ষেত্রে বাসে দাঁড়িয়ে যাওয়া তেমন কষ্টের কিছু না। যদি কিনা আপনারা কোনো রকমের হয়রানি না করেন তাহলে।
এবার আসি একটু সাইবার নিপীড়ন বিষয়ে। আমার এই আলোচনাটা যেহেতু নারীকেন্দ্রিক, তাই নারীর সাইবার নিপীড়নের কথা বলা যাক। এই আধুনিক প্রযুক্তির একটা নেতিবাচক দিক হলো সাইবার নিপীড়ন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীরা নানাভাবে হয়রানি হচ্ছে। যেমন—প্রেমের সম্পর্কের ছবি-ভিডিও, ফেসবুকে ছেড়ে মেয়েটাকে ব্লাকমেইলের চেষ্টা করা হয়। এছাড়াও যৌতুক, উত্ত্যক্তকরণ, অ্যাসিড, সন্ত্রাস, বাল্যবিবাহ ও ধর্ষণ তো আছেই। পৃথিবীতে একমাত্র প্রাণী মনে হয় নারী, যাদের সঙ্গে এত রকমের অন্যায় করা হয়। সামাজিক সমস্যাগুলোর প্রায় বেশির ভাগই নারীদের। যেহেতু সমাজে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে, তবুও নারীদের অধিকার নিয়ে কিন্তু সেই পরিবর্তন টা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে হয়নি।
সর্বোপরি, পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলতে চাই। আমাকে নারীবাদী ভেবে গালাগাল দিবেন না। আমি/আমরা বেশি কিছু চাই না। শুধু আমাদের পাওনাটুকু চাই, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই, মানুষের মতো করে বাঁচতে চাই। তাছাড়াও বর্তমান সরকার মেয়েদের স্বাবলম্ব্বী করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তাই আপনাদের (পুরুষদের) কাছে একটাই চাওয়া, প্রতিযোগী না ভেবে সহযোগী ভাবুন। তাহলে একসঙ্গে কাজ করে দেশ ও জাতিকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে পারব। চলুন আমরা সবাই মিলে দেশটাকে পালটে দেওয়ার চেষ্টা করি এবং একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলি।
n লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়