তদন্ত ঝুলিয়ে রাখায় দায়ীদের চিহ্নিতে তদন্তের নির্দেশ

নাসির গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থপাচার মামলার তদন্ত চার বছর ধরে ফেলে রাখার ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের আদেশের পরও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কেন এতদিনে তদন্ত সম্পন্ন করেনি তা ৪০ দিনের মধ্যে তদন্ত করতে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা আদালতকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। 

এ সংক্রান্ত মামলার শুনানি শেষে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রবিবার এই আদেশ দেন। আদালত বলেন, অধিকতর তদন্তের জন্য বিএফআইইউকে হাইকোর্ট চার বছর আগে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু এতদিনেও কোনো অগ্রগতি নাই। শুধু চিঠি চালাচালির বিষয়টি দেখতে পাচ্ছি। উচ্চ আদালতের আদেশ প্রতিপালন না করার এই দায় কার। এদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

এছাড়া নাসির গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার মামলার তদন্ত চার মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে বিএফআইইউকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই সময় পর্যন্ত এই মামলার আসামি নাসির গ্রুপের চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্টদের ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে হাজিরা মওকুফ করেছে হাইকোর্ট। আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী ও নাসিরউদ্দিন বিশ্বাসের কৌসুলি মাহবুবুর রহমান কিশোর। 

৫৬ কোটি টাকা অর্থ পাচারের অভিযোগে ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গুলশান থানায় নাসির গ্রুপের চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন বিশ্বাস, মো. আলফাজ উদ্দিন (জিএম, আমদানি) সহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না নিয়ে দেশের প্রচলিত আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে নাসির গ্রুপের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কাঁচামাল ও পণ্যাদি আমদানির নামে আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে ৫৬ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ৮২ টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ ধারায় অপরাধ। এজাহারে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অপরাধ সংঘটনের সময়কাল উল্লেখ করা হয়। 

তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা। এতে মামলার আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ ওই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়। বিশেষ জজ আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেন নাসির গ্রুপের চেয়ারম্যান। ২০১৭ সালে বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এ সংক্রান্ত রুল নিষ্পত্তি করে এই অর্থ পাচারের মামলাটি তদন্তের জন্য বিএফআইইউকে নির্দেশ দেন।

ঐ নির্দেশের পর পেরিয়ে গেছে চার বছর। কিন্তু বিএফআইইউ তদন্ত সম্পন্ন না করায় পুরো মামলা বাতিল চেয়ে গত নভেম্বর মাসে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(ক) ধারায় হাইকোর্টে আবেদন করেন নাসিরউদ্দিনসহ অন্যান্য আসামিরা। এরপরই আবেদনটি শুনানির জন্য আসে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চে। হাইকোর্ট মামলার অধিকতর তদন্তের অগ্রগতি জানতে চায় বিএফআইউউর কাছে। কিন্তু বিএফআইইউর পক্ষ থেকে মামলার তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে কোনো তথ্য হাইকোর্টকে জানাতে পারেনি। রবিবার আদেশদানের পূর্বে এ বিষয়ে বিএফআইউর আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভীর পারভেজের উদ্দেশ্যে উষ্মা প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেন, বিএফআইউ কেন উচ্চ আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করলো না, এই দায়িত্বহীনতার কি হবে। সর্বশেষ কি অবস্থা সেটাও তো জানাতে পারলেন না আপনারা। 

নাসিরউদ্দিনের আইনজীবী মাহবুবর রহমান কিশোর বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশের পর চার বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ করতে পারেনি। কিন্তু আমাদের প্রতি ধার্য তারিখে নিম্ন আদালতে হাজিরা দিতে হয়। এটা হয়রানি ছাড়া আর কিছুই নয়। 
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আপনার (নাসির উদ্দিন) পক্ষেই তো বিএফআইইউ কাজ করেছে। যাতে তদন্তের বিলম্বের কারণে আপনি মামলা বাতিলের জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করতে সুবিধা হয়। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী বলেন, বিএফআইইউ এটা কতদিন ঝুলিয়ে রাখবে। তদন্ত তো শেষ করতে হবে। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট উপরোক্ত আদেশ দেন। 

 

ইত্তেফাক/ইউবি