যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত প্রেসিডেন্ট হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষমতায় থাকাকালে একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য ও পদক্ষেপের কারণে সব সময় আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। ক্ষমতা ছাড়ার পরও তিনি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি দুইবার মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি নিম্নকক্ষে অভিশংসিত হওয়ার পর দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লড়েছেন। ৭ কোটির বেশি ভোট পেয়ে তিনি পরাজিত হয়েছেন। তিনি নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে হোয়াইট হাউজ ছেড়ে গেছেন। কিন্তু এখনো তিনি পরাজয় স্বীকার করেননি।
আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন বিচার শুরু হতে চলেছে। সেখানে তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে ভবিষ্যতে কোনো সরকারি পদে আসতে পারবেন না। গত ৬ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসের ভবন ক্যাপিটলে তার সমর্থকরা হামলা চালায় যেখানে ৫ জন নিহত হন। এই হামলায় ট্রাম্প উসকানি দিয়েছেন এমন অভিযোগেই প্রতিনিধি পরিষদে তিনি অভিশংসিত হয়েছেন। কিন্তু সিনেটে তার অভিশংসিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোট দরকার হবে। সেক্ষেত্রে তার রিপাবলিকান পার্টির কমপক্ষে ১৭ সদস্যকে তার বিরুদ্ধে ভোট দিতে হবে। এখন পর্যন্ত যে অবস্থা তাতে সে সম্ভাবনা কম।
যদিও রিপাবলিকান পার্টির নেতারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থকরা যে ঘটনা ঘটিয়েছে এবং নির্বাচন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেসব মন্তব্য করেছেন তাতে তার পক্ষ নেওয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই। কিন্তু তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করতে রাজি নন। তারা দলের ভেতর কোনো কোন্দল বা বিভক্তি তৈরির ঝুঁকি নিতে চান না। তারা বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই ছেড়ে দিতে চান।সাধারণত ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন না। এটা মার্কিন রাজনীতির একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেলায় সেটা হচ্ছে না! কারণ হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন আবারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য লড়বেন তিনি।
হোয়াইট হাউজ ছেড়ে বর্তমানে তিনি ফ্লোরিডার পাম বিচের মার-এ লাগো রিসোর্টে অবস্থান করছেন। এটাই এখন তার বসবাসস্থল। ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউজ ছাড়ার পর গত বৃহস্পতিবার তিনি প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান নেতা কেভিন ম্যাককার্থির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানেই তিনি জানিয়েছেন যে, রাজনীতি ছাড়ছেন না। ঐ বৈঠকের পর ট্রাম্পের ‘সেভ আমেরিকা পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি’-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আজকের মতো এতোটা মজবুত আগে কখনো ছিল না। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে ট্রাম্প রিপাবলিকান নেতাদের সঙ্গে কাজ করবেন। ম্যাককার্থি এক বিবৃতিতে বলেন, রিপাবলিকান পার্টি এখন একতাবদ্ধ এবং জিততে প্রস্তুত।
শুক্রবার সিএনএনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, নির্বাচনে হারার পরও ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। ঐ নিবন্ধে বলা হয়েছে, তিনি এখন আর প্রেসিডেন্ট নন, তার হাতে টুইটারের বড় ফোনও নেই। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, এখনো এটি ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। সিনেটে যাতে ট্রাম্পের অভিশংসন বিচার না হয় সেজন্য ৫০ জন রিপাবলিকান সিনেটরের মধ্যে ৪৫ জন ভোট দিয়েছেন।
প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার কারণে হাউজের তৃতীয় প্রধান রিপাবলিকান নেতা লিজ চেনি চাপের মুখে রয়েছেন। ভোট দেওয়া অন্য সদস্যরাও নানামুখী চাপের মুখে রয়েছেন। দলটির রাজ্য ও স্থানীয় নেতারা ট্রাম্প বিরোধীদের শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ কারণে ভবিষ্যতে নির্বাচনে হারার ভয়ে অনেক রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের বিরোধিতা করার সাহস পাচ্ছেন না।
বিভিন্ন জরিপের ফল বলছে, আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভালোভাবেই এগিয়ে রয়েছেন। ইপসোস নলেজপ্যানেল জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পেরই প্রার্থী হওয়া উচিত বলে মনে করেন ৫৭ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক। এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বি না থাকায় মাঠে একাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, কিছুদিন আগে পরাজিত হওয়া প্রেসিডেন্টের এই অবস্থান খুবই অস্বাভাবিক। যা আগে জিমি কার্টার বা জর্জ এইচ বুশের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। এর কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সমর্থকদের এটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তিনি পরাজিত হননি বরং জালিয়াতি করে তাকে হারানো হয়েছে। আর হয়তো ভবিষ্যতেও কোনো প্রমাণ ছাড়াই এই দাবি অব্যাহত রাখবেন তিনি। যাতে রিপাবলিকান পার্টিতে গুরুত্ব ও প্রভাব বজায় থাকে।
ইত্তেফাক/এএইচপি