আমরা যদি আধুনিক ও নিরাপদ বিপণিবিতান এবং বাজারের কথা চিন্তা করি, তাহা হইলে সেই সকল ভবনের যথাযথ উচ্চতা, দোকান ও ক্রেতা-বিক্রেতা অনুপাত এবং অগ্নিনির্বাপকের যথাযথ ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। অতিরিক্ত লোকসমাগমের স্থানে ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র থাকিবে। বিপণিবিতানের প্রবেশদ্বার হইবে প্রশস্ত, জরুরি নির্গমনব্যবস্থাও থাকিবে। ইহা ছাড়া মাটির নিচের জলাধারের ধারণক্ষমতা, ফায়ার পাম্প বা জকি পাম্প, সতর্কসংকেতের ব্যবস্থা থাকাটাও অপরিহার্য। কিন্তু কাজির গরু কিতাবে থাকিলেও বাস্তবে উহার দেখা পাওয়া মুশকিল। অন্তত বাংলাদেশে। কারণ উপরের শর্তাবলির বিচারে রাজধানীর দুইটি সিটি করপোরেশনের ৯৬ শতাংশ বাজারই বিপজ্জনক। পত্রিকান্তরে জানা গিয়াছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, গুলশান, ফার্মগেট, কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন স্থানের মার্কেট অনেক দিন ধরিয়াই ঝুঁকিপূর্ণ। ইহা ছাড়াও, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নিজেদের ৪৩টি মার্কেটের মধ্যে ২৭টি মার্কেট লইয়া চরম বিপাকে পড়িয়াছে। ইহার মধ্যে একটি বেদখল হইয়া গিয়াছে, হারাইয়া গিয়াছে দুইটি, ২২টি মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ, একটিতে মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ এবং আরেকটিতে কোভিড-১৯ পরীক্ষাগার করা হইয়াছে। অন্যদিকে, মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের প্যারিস রোড-সংলগ্ন নিউ ডিএনসিসি মার্কেটটির নির্মাণকাজ প্রায় ২৫ বত্সর পূর্বে শুরু হইয়াছে। বিভিন্ন সময় সরকার পরিবর্তন, মেয়র বদল, সিটি করপোরেশন বিভক্তিসহ বিভিন্ন কারণে ঐ মার্কেটের অনেক কাজ এখনো শেষ হয় নাই। ফলে, মার্কেটটির অনেক স্থানে দেওয়ালে শ্যাওলা জমিয়াছে, খসিয়া পড়িতেছে পলেস্তারা। এই সকল মার্কেট লইয়া অসংখ্য সংবাদ প্রায়শই প্রকাশিত হইয়া থাকে।
আমাদের ছোট্ট একটি দেশ, সাড়ে ষোলো কোটির অধিক জনসংখ্যা। ইহার মধ্যে রাজধানীর জনঘনত্ব স্বাভাবিক বসবাসের জন্য অচিন্ত্যনীয়। তাহার পরও, বিপুল ও অলঙ্ঘনীয় বিচিত্র সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও ধীরে সুস্থে আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হইতেছে। মনে রাখিতে হইবে, বিগত অর্ধশতকে আমাদের কাদামাটি ভরা কাঁচা রাস্তা এবং অস্থায়ী বাজার অবকাঠামো হইতে উত্তরণ ঘটাইয়া আমরা ক্রমশ এক অভূতপূর্ব উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হইতেছি। একইভাবে আমাদের বাজারব্যবস্থাও আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত ও বিকশিত হইয়াছে। এককালে সামান্য ছাউনির বাজারের অধিক কিছু আমরা আশা করিতে পারিতাম না। তাহার পর সেমি-পাকা এবং বিপুলসংখ্যক পাকা বাজার হইয়াছে। কিন্তু ইহা ভুলিয়া গেলে চলিবে না, ইউটোপীয় রাষ্ট্রের মতোই আদর্শ উন্নয়ন অবকাঠামো খুব সহজ ব্যাপার নহে। অবকাঠামো উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সুতরাং যত ধরনের সমস্যা রহিয়াছে তাহার সমাধান আস্তেধীরে হইবে নিশ্চয়ই।
তবে বাজারের উন্নয়নের পাশাপাশি আরো একটি বিষয়ের উন্নয়ন জরুরি। তাহা হইল মানুষের সিভিক-সেন্সের উন্নয়ন, মানসিকতার উন্নয়ন। বলা হইয়া থাকে, দারিদ্র্য নিজেই দূষণ তৈরি করে। সুতরাং আমাদের দারিদ্র্যের উন্নয়ন প্রয়োজন, শিক্ষার উন্নয়ন প্রয়োজন। যাহাদের জন্য অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হইবে, তাহারা যদি নোংরা অপরিচ্ছন্ন এবং অপ্রশিক্ষিত হয়, তাহা হইলে সুন্দর অবকাঠামো নষ্ট হইতে অধিক সময় লাগে না। যাহারা ন্যূনতম নিয়মনীতির ধার ধারেন না, তাহাদের হাতে পড়িলে সুন্দর ফুলের বাগানও নষ্ট হইতে সময় লাগিবে না। যদি কোনো বাজারের দোকানদাররা অগ্নিনির্বাপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত না হন এবং নিয়ম করিয়া মহড়া না হয়, তাহা হইলে ঐ যন্ত্র থাকা আর না থাকা সমান ব্যাপার। আমরা জানি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন পূর্বে বা পরে ভালোমতোই হইবে। কিন্তু এই উন্নয়নের পাশাপাশি সকল স্তরের মানব উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি।