অসমাপ্ত সেতু ও অন্তহীন জনদুর্ভোগ

বাংলাদেশে কোনো কোনো সেতু নির্মাণের কাজ বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া পড়িয়া রহিয়াছে। সেতুর কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন না হইলে মানুষের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। ইহাতে পূর্বের মতোই মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়া চলাচল করিতে হয়। প্রায়শ ঘটে দুর্ঘটনাও। শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাইতে ভয় পায়। কৃষক ও ব্যবসায়ীকগণ তাহাদের পণ্য পরিবহনে সমস্যায় পড়েন। এমনই একটি সেতু হইল সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কানাইদিয়া ও খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি পয়েন্টে অবস্থিত কপোতাক্ষ সেতু। ভাবিতেও অবাক লাগে, সেতুটির নির্মাণকাজ গত ১৯ বত্সরেও শেষ হয় নাই! এমনকি ব্রিটিশ শাসনামল হইতে স্বপ্নদেখা এই সেতুটি আজও অধরা হইয়া রহিয়াছে। সেই সময় কপিলমুনি-কানাইদিয়া সেতুর মাধ্যমে সাতক্ষীরা সদর হইয়া কলকাতা পর্যন্ত সরাসরি সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়িয়া তুলিবার পরিকল্পনা করা হইয়াছিল। কিছু লোকের বিরোধিতা ও ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের জন্য তাহার বাস্তবায়ন হয় নাই। ইহার পর পাকিস্তান আমল গিয়াছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে; কিন্তু আজ অবধি মানুষের সেই স্বপ্ন পূরণ হয় নাই। অবশেষে ২০০০ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে এই ব্রিজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়; কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আংশিক কাজ করিয়া ব্যাংক হইতে ১ কোটি ৬৭ লক্ষ ৭২২ টাকার বিল উত্তোলন করিয়া নির্মাণকাজ বন্ধ করিয়া দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে ইহা নিয়া মামলা হয় এবং সেতুর কাজ অনিশ্চিত হইয়া পড়ে। দ্বিতীয় ঠিকাদার নিযুক্ত করা হইলে তাহারাও একই পথ অনুসরণ করেন।

সেতুটির নির্মাণকাজ ফেলিয়া চলিয়া যাইবার পর সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ লইয়াছেন? তাহারা কি মামলায় ঠিকমতো লড়িয়াছিলেন? আমাদের গোড়ায় গলদ তথা সিস্টেমেই ত্রুটি রহিয়াছে। এই যে এত সরকারি অর্থের অপচয় হইতেছে তাহার দায়ভাগ কে লইবে? এই জন্য কি কোনো জবাবদিহি থাকিবে না? তাহা হইলে এসও, এসডি, অ্যাডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও চিফ ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তার দায়িত্ব আসলে কী? এলজিইডির প্রকৌশলীগণ বলিতেছেন, এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হইয়া গিয়াছে অনেক পূর্বেই। এখন নূতন করিয়া কাজ শুরু করিতে হইবে; কিন্তু নূতন করিয়া শুরুর কাজটি কবে নাগাদ শুরু হইবে তাহা কেহ জানেন না। মূলত সকল সরকারের আমলেই এমন কিছু জটিলতা তৈরি হয়, যাহাতে অনেক সেতুর কাজ শুরু করিয়াও শেষ করা যায় না। এই সেতু লইয়া মানুষের বিভিন্ন রকমের বিড়ম্বনার শেষ নাই। অনেক সময় দেখা যায়, সেতু নির্মাণ করা হইয়াছে ঠিকই; কিন্তু সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয় নাই। ফলে সেই সেতু কোনো কাজে আসে না।

সেতুর অর্ধেক কাজ শেষ হইবার পর নির্মাণাধীন সেতুর উচ্চতা লইয়াও কখনো কখনো প্রশ্ন ওঠে এবং সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ হইয়া যায়। ইহা সরকারি প্রতিষ্ঠানের একধরনের খামখেয়ালিপনা ছাড়া আর কিছু নহে। নৌকা ও ফেরির সহিত সংশ্লিষ্ট কেহ কেহ চাহেন না দ্রুত সেতু নির্মিত হউক। এইভাবে আমাদের দেশে সেতু নির্মাণসহ সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় সমস্যা। এই ধরনের বিলম্বের জন্য যথাযথ জবাবদিহি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে নজির তৈরি করিতে হইবে। স্থানীয় প্রশাসনকে হইতে হইবে জনবান্ধব। কয়েক বত্সর পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চট্টগ্রামে শাহ আমানত বিমানবন্দর সড়কের তিনটি সেতুর নির্মাণকাজ অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে (দুই বত্সরের স্থলে  মাত্র তিন মাসে) সম্পন্ন হয়। অর্থাত্ আন্তরিকতা থাকিলে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব।