জলাভূমি রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা

জলাভূমি বা ইংরেজিতে ‘ওয়েটল্যান্ডস’ হলো এমন একটি স্থান বা এলাকা, যার মাটি মৌসুমভিত্তিক অথবা স্থায়ীভাবে আর্দ্র বা ভেজা থাকে। রামসার কনভেনশন অনুযায়ী জলাভূমি বলতে বোঝায় অল্প স্রোতযুক্ত ছয় মিটারের কম গভীরতার এলাকাসম্পন্ন নিচু ভূমি, যার পানির উত্স প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম, পানির স্থায়িত্বকাল সারা বছর বা মৌসুমভিত্তিক, পানি স্থির বা গতিশীল, স্বাদু বা সামান্য থেকে বেশি লবণাক্ত। মার্শ, মোহনা, কাদা-চর, ফেন্স, পকোসিন্স, সোয়াম্পস, ডেলটাস, প্রবালদ্বীপ, বিলাবঙ্গস, লেগুন, অগভীর সমুদ্র, বগ, হ্রদ ইত্যাদি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের জলাভূমি, যা সমস্ত পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকারের জলাভূমির মধ্যে রয়েছে প্লাবনভূমি, নিচু জলা, বিল, হাওর, বাঁওড়, জলমগ্ন এলাকা, উন্মুক্ত জলাশয়, নদীতীরের কাদাময় জলা, জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত নিচু সমতলভূমি এবং লবণাক্ত জলাধার। পৃথিবীর প্রায় ১৩ থেকে ১৮ শতাংশ ভূভাগ জলাভূমির অন্তর্গত। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ১৭৫টি জলাভূমি রয়েছে যুক্তরাজ্যে। সবচেয়ে বেশি জলাভূমির অন্তর্গত ভূভাগ রয়েছে রাশিয়াতে, যা প্রায় ১৪ কোটি হেক্টরেরও বেশি। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী ইরানের রামসার শহরে ১ম জলাভূমি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ‘কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস’ নামক একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে জলাভূমির উপযোগিতা বিশ্লেষণ করা হয়।

এশিয়ার অন্যতম বৃহত্ মিঠাপানির জলাভূমি ও বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ হাওর হচ্ছে হাকালুকি। এর আয়তন ১৮,১১৫ হেক্টর, তার মধ্যে শুধু বিলের আয়তন ৪,৪০০ হেক্টর। এটি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা (৪০%) কুলাউড়া (৩০%) এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ (১৫%) গোলাপগঞ্জ (১০%) এবং বিয়ানীবাজার (৫%) জুড়ে বিস্তৃত। এর উত্তরে ভারতের মেঘালয় এবং পূর্বে ত্রিপুরা পাহাড় অবস্থিত। উজানে প্রচুর পাহাড় থাকায় হাকালুকি হাওরে প্রায় প্রতি বছরই আকস্মিক বন্যা হয়। ছোট-বড় ২৪০টি বিল ও ছোট-বড় ১০টি নদী নিয়ে গঠিত হাকালুকি হাওর। হাকালুকি হাওরে ৫২৬ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪১৭ প্রজাতির পাখি (১১২ প্রজাতির অতিথি পাখি এভয় ৩০৫ প্রজাতির দেশীয় পাখি), ১৪১ প্রজাতির অন্যান্য বন্যপ্রাণী, ১০৭ প্রজাতির মাছ রয়েছে। রয়েছে ১২০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ এবং বিলুপ্তপ্রায় ২০ প্রজাতির সরীসৃপ। এছাড়া রয়েছে নানা ধরনের কীটপতঙ্গ, জলজ ও স্থলজ ক্ষুদ্র অনুজীব। এখানে প্রতি বছর শীতকালে প্রায় ২০০ বিরল প্রজাতির অতিথি পাখির সমাগম ঘটে। হাকালুকি হাওরকে ‘প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা’ বিবেচনা করা হয়। এই হাওরে বাংলাদেশের মোট জলজ উদ্ভিদের অর্ধেকের বেশি এবং বহু সংকটাপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি পাওয়া যায়। শীতকালে হাওরের দিগন্তবিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিলের কান্দিগুলো সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। শীতকালে অতিথি পাখিরা সার বেঁধে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসতে থাকে বিলগুলোতে। হাকালুকি হাওর টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ইকোট্যুরিজম শিল্প বিকাশের এক অসাধারণ আধার।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ এবং এদেশের প্রায় ৮ লাখ হেক্টর ভূমি কোনো না কোনোভাবে জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত। মত্স্যও জলজ প্রাণিসম্পদ খাতে জলাভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। সারা পৃথিবীর মোট আহরিত মাছের দুই তৃতীয়াংশ আসে জলাভূমি থেকে। এছাড়াও বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় মত্স্য প্রজাতি সংরক্ষণে জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্ষার সময় অতিরিক্ত পানি ধারণ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে জলাভূমি। সাধারণত জলাভূমির পানির মধ্যে জলজ বাস্তুসংস্থানের প্রাথমিক খাদ্য উত্পাদক তৈরি হয়ে থাকে, যা ধারাবাহিক গতিতে জন্ম দেয় অন্যান্য খাদ্যশৃঙ্খলের। খাদ্য উত্পাদনশীলতার হিসাবে পৃথিবীর মোট উত্পাদনের ২৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে জলাভূমি, যা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রধান উত্স হিসেবে কাজ করে। এছাড়া পৃথিবীর প্রায় ৩ বিলিয়ন মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত, যা আসে ধান থেকে আর এই ধানের বেশির ভাগই উত্পাদিত হয় জলাভূমিতে। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর ৫ লাখ মিলিয়ন টনেরও বেশি ধান উত্পাদিত হয়। পৃথিবীর শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে বাঁচার জন্য যেসব পরিযায়ী পাখি উষ্ণতর দেশগুলোতে আসে, তাদের প্রধান আশ্রয়স্থল হয় এসব জলাভূমি। জলাভূমিতে জন্মানো নানাবিধ উদ্ভিদ রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়। কাগজ তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়ে থাকে অনেক জলজ উদ্ভিদ। পাট পচাতে এবং ক্ষেত্রবিশেষে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রেও জলাভূমি ব্যবহূত হয়ে থাকে। সহজ ও স্বল্পব্যয়ের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে জলাভূমি বিশেষ ভূমিকা রাখে, যার উদাহরণ কাপ্তাই লেক। জলাভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর অনেক সভ্যতা ও সংস্কৃতি, সৃষ্টি করেছে বহুবিধ কর্মসংস্থানের। এছাড়াও একটি দেশের পর্যটনশিল্প ও বিনোদনের একটা বড় কেন্দ্র হলো এসব জলাভূমি। পরিতাপের বিষয় এই যে, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এখনো পর্যন্ত যে ১২টি এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বলে ঘোষণা করা হয়েছে তার মধ্যে সুন্দরবন, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর থেকে শুরু করে প্রায় সব কটি জলাভূমিই রয়েছে। কাজেই যথাযথ সময়ে জলাভূমিগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনায় যত্নবান হলে এসব অবারিত সম্পদগুলোর সংকটাপন্ন অবস্থায় রূপান্তর ঠেকানো যেতে পারে।

n লেখক :প্রফেসর ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ