‘মাত্র সাত বছর বয়সেই বুঝে গেলাম আমি অন্যদের মতো না। স্কুলে ছেলেদের কাছে বসলে তারা উঠে চলে যেত। আবার মেয়েদের কাছেও বসতে পারতাম না। খুব কষ্ট হতো। কিন্তু অল্প দিনেই এই কষ্ট আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেল, যখন আমার নিজের বাড়ির লোকজন আমাকে ‘দুরদুর-ছাইছাই’ করা শুরু করল। হঠাত্ করেই যেন সব কিছু বদলে গেল। আপনজন পর হয়ে গেল। কি করব কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।’
কথাগুলো প্রায় এক নিঃশ্বাসে বললেন পরিমনি। পরিমনি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গা গ্রামের সরস্বতী নদীর তীর ঘেঁষে সদ্য গড়ে ওঠা আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ‘প্রিয় নীড়’-এ তৃতীয় লিঙ্গের আরো অনেকের সঙ্গে নতুন ঘর পেয়েছেন পরিমনিও। স্বাভাবিকভাবেই তার আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
নতুন সেই ঘরের সামনে বাঁশের মাঁচার ওপর বসে ২২ বছরের পরিমনি জানান, মাথার ওপর একটু ছাদের নিশ্চয়তা যে কতটা প্রশান্তির, যার নেই সেই বোঝে। আর আমাদের মতো অবহেলিত মানুষ হলে তো কথাই নেই। তিনি বলেন, সাত বছর বয়সে যখন ঘর ছাড়লাম তখন স্বপ্নেও ভাবিনি একদিন আমার নিজের ঘর হবে। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য ভাবেন, সত্যি ভালো লাগছে।
পরিমনির মতো মাথার ওপর এক টুকরো ছাদ পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত প্রিয় নীড়ের সোনিয়া, মায়া, গৌড়ি, বাহা মনি, মেঘলা, জলি, রুপা, জবা, ফুলজান, সালাম, রেশমি, মুর্শিদাসহ আরো অনেকে। তারা এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় এখানে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য ৬৬ শতাংশ খাসজমিতে পাঁচ ইউনিটের সেমিপাকা চারটি ব্যারাকে আবাসন গড়ে তোলা হয়েছে। ২০ জন হিজড়ার নামে এই ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়া হলেও বর্তমানে ৫০ জন এখানে থাকছেন। তবে বাকি ৩০ জনের নামেও পর্যায়ক্রমে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে শুধু ঘর বরাদ্দই নয়, তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষদের পুনর্বাসনেও নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এখানে পুনর্বাসিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সেলাই ও গবাদিপশু পালনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে ১০টি গরু। সেই সঙ্গে এখানে খালি জায়গায় তারা গড়ে তুলেছেন শাকসবজির খামার।
তৃতীয় লিঙ্গের সোনিয়া খামারে গরুর পরিচর্যা করতে করতে বলেন, আমরা ভিক্ষে করে আমাদের জীবন চালাতে চাই না। চাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে। তাই আমরাও চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, আমি ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছি। খুব ইচ্ছা ছিল আরো পড়াশোনার। কিন্তু সমাজের মানুষের চাপে পারিনি।
কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরল গৌড়িরও। তিনি বলেন, মানুষ আমাদের খারাপ বলে। কিন্তু আমরা কীভাবে চলি তা কেউ বুঝতে চায় না। আমাদের থাকার জায়গা ছিল না, সমাজের ভয়ে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না। গৌড়ি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছেন, বেঁচে থাকার অবলম্বন দিয়েছেন। আল্লাহ, উনার ভালো করুন।
উল্লেখ্য, সারা দেশে বর্তমানে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। ২০১৩ সালের হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার।