কোভিডের টিকা তৈরির নতুন প্রযুক্তি নিয়ে যত প্রশ্ন

পশ্চিমা জগতে কোভিড-১৯কে বশে আনতে ‘আরএনএ’ ও ‘ডিএনএ’ টিকা ছাড়া কোনো কথা নেই। এগুলো সবই ‘জেনোম’ বা ‘জিন-এডিটেড’ টিকা ওরফে জেনিটিক্যালি মোডিফাইড টিকা। এসব ‘জিন-এডিটেড’ টিকা বানাচ্ছে বহুজাতিক-কাম-বহু বিলিয়ন ডলারভিত্তিক বৃহৎ ফার্মাগুলো।

এই অভূতপূর্ব গোষ্ঠীভুক্ত টিকার সারমর্ম হলো: সার্স-কভ-২ ওরফে কোভিড-১৯ নামক করোনা ভাইরাসটিকে মোক্ষম ফাইট দিতে মানুষ নামক প্রাণীসত্তার অদৃশ্য ন্যানো-জগতে, অর্থাৎ ডিএনএ ও আরএনএর ‘সফটওয়্যার’ নতুন করে লিখতে হচ্ছে। ২০১৭ সালে মডার্নার চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডা. টেল জ্যাকস ‘টেড টকে’ (টিইডি টক) যা বলেছেন তার সারমর্ম হলো, ‘এসো নিজে করি’ কায়দায় আমরা প্রাণীর প্রকৃতজাত সফটওয়্যারকে হ্যাক করছি। এই হ্যাক করার বিষয়টি বুঝতে হলে ২০ মে, ২০২০ সালে ‘ইনডিপেনডেন্ট’-এ প্রকাশিত ডা. ইউজিন গিউর প্রতিবেদনটি পড়ে দেখা যেতে পারে।

অনেক বড় ফিলানথ্রপি, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডাভস), বিসাস, বিগ-ফার্মাগুলো এ কাজে সঙ্গে সঙ্গে রাজি! ‘মনসান্তো’ অনেক বছর ধরে ফলমূল, সবজি, ধান, গমসহ সম্ভাব্য অনেক কিছুর জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন ধরনের খাদ্য উত্পাদন করে আসছিল বটে, তবে ‘বহুরূপী’ ভাইরাসকে জব্দ করতে জিন-এডিটিংয়ের ব্যবহার এই প্রথম। টিকা বানাতে সত্তর-আশি বছরের পরীক্ষিত প্ল্যাটফরম রয়েছে। কিন্তু কোভিডের টিকার জন্য নতুন রীতি ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২০ সাল বিদায় নেওয়ার আগেই ঝটিকাবেগে কোভিডের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অ্যাস্ট্রাজেনিকা-অক্সফোর্ড, ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্না ‘জরুরি ব্যবহারের জন্য’ নামক সিল-ছাপ্পর নিয়ে গণ-ট্রায়ালে নেমেছে। বলা যায়, বর্তমানে ব্যাপক হারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ট্রায়াল পর্ব চলছে।

তাই খুবই অপরিচিত পরিভাষা ‘ডিএনএ’, ‘আরএনএ’কে নিয়ে ‘আদার ব্যাপারী’ বেশ ভাবনায় পড়েছেন। ‘ডিএনএ’ ও ‘আরএনএ’—উভয়েই প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ‘জৈব বা অর্গানিক মলিকিউল’। এবং এদের মাধ্যমে কে কী কাজ করবে বা করছে তা প্রকৃতি সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ করে দিয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে ‘ডিএনএ’ হলো ‘প্রাকৃতিক ব্যাংক’; আমাদের চেনাজানা সব প্রাণিসত্তা ও বহুসংখ্যক ভাইরাসের বিকাশ, কর্মতত্পরতা ও কর্মক্রিয়া, প্রবৃদ্ধি, পুনর্জনন সংশ্লিষ্ট নির্দেশাবলি, ক্রমাগত পারম্পরিক বস্তু বা উপাদান এই ডিএনএতেই সঞ্চিত বা জমা রয়েছে। এগুলোকে বলা হয় ‘জেনিটিক নির্দেশাবলি’। অর্থাত্, অধিকাংশ ভাইরাস ও প্রাণসত্তার জিনগত বস্তু বা উপাদানের ব্লুপ্রিন্ট এই ডিএনএ-ব্যাংকে জমা রয়েছে। ডিএনএর মতো ‘আরএনএ’ও জৈব বা অর্গানিক মলিকিউল। ‘ডিএনএ’র নিবাস জীবকোষের নিউক্লিয়াসে এবং ‘আরএনএ’র নিবাসও জীবকোষের অভ্যন্তরে, তবে থাকে ‘সাইটোপ্লাজম’ (Cytoplasm) নামক ঘন দ্রবণের মধ্যে। এই আরএনএর কাজ হলো ডিএনএর নির্দেশাবলি প্রোটিনে রূপান্তরিত করে (জীব)কোষীয় কর্মকাণ্ড সম্পাদন করা।

প্রাণিসত্তার মধ্যে ডিএনএর যে সর্বমোট সমষ্টি রয়েছে, তাকে ‘জেনোম’ (Genome) বলা হয়। আর রূপকথার মতো মনে হলেও সত্যি যে ডিএনএ মাত্র চারটি কেমিক্যালের প্রতিটির প্রথম অক্ষর (এ, জি, সি এবং টি) দিয়ে তৈরিকৃত বর্ণমালা বা ভাষাকে সম্বল করে সম্পূর্ণ মানবদেহের অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে! অর্থাত্ কিনা প্রাণিসত্তার ‘আইডেনটিটি’ নির্ধারণের জাদুমন্ত্র এই বর্ণমালার মধ্যে লুকিয়ে আছে। ডিএনএর বর্ণমালার বর্ণগুলো জোড়ায় জোড়ায় পাকানো মইয়ের মতো রূপ নিয়ে রয়েছে; এটিই ওয়াটসন-ক্রিকের ‘ডবল হেলিক্স’ (ওয়াটসনের লেখা ‘দ্য ডবল হেলিক্স’ বইটি পড়ে দেখুন)। মানবদেহের প্রায় প্রতিটি কোষ প্রায় তিন বিলিয়ন (ডিএনএর) ‘জোড়বদ্ধ বর্ণের’ অনুকৃতি ধারণ করে আছে এবং নির্মিত হয়েছে মানব জেনোম। জিনের সৃষ্টি ডিএনএ থেকে বা জিনকে ডিএনএর কর্তিতাংশও বলা যায়। একটি প্রোটিনের অনুকৃতি ধারণ করতে যতটুকু ডিএনএর প্রয়োজন হয়, একটি জিন ঠিক ততটুকু ডিএনএ দিয়ে তৈরি। আরএনএর গঠন অবশ্য ডিএনএর মতো দ্বৈত আঁশের (ডবল স্ট্যান্ড) নয়, একক আঁশের (সিঙ্গল-স্ট্যান্ড) এবং বিভিন্ন রূপে তার প্রকাশ ঘটতে পারে। ‘একক আঁশ’ হওয়ায় আরএনএর মলিকিউলগুলো নিজেরা ভাঁজ হয়ে হয়ে পরিপাটিভাবে থাকতে পারে এবং দরকারমতো বিভিন্ন রকমের অপ্রধান কিন্তু স্থিতিশীল নির্মিতি তৈরি করতে সক্ষম।

‘আরএনএর কাজ হলো জীবকোষের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ডিএনএর সরবরাহকৃত নির্দেশাবলিকে প্রোটিনে রূপান্তরিত করে কোষীয় কর্মকাণ্ডগুলো সম্পন্ন করা। এই কর্মকাণ্ডসমূহ সম্পাদনের জন্য রয়েছে হরেক ধরনের ‘আরএনএ’। তবে মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA), ট্রান্সফার আরএনএ (tRNA) ও রিবোসমাল আরএনএ (rRNA) সবচেয়ে পরিচিত আরএনএ। এদের ওপরে প্রচুর গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রোটিন তৈরির রূপরেখা বা আউটলাইন ঠিকঠাক করে দেওয়ার দায়িত্ব মেসেঞ্জার আরএনএর। এই তিন ‘আরএনএ’সহ অন্য সব শ্রেণিভুক্ত আরএনএর প্রাথমিক কর্ম হলো জৈব রসায়ন প্রতিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া।

জিন এডিটিং হলো একধরনের জেনিটিক প্রকৌশল। অর্থাৎ মানুষের তৈরি এই প্রকৌশল ব্যবহার করে জীবিত প্রাণসত্তার জেনোমে ‘ডিএনএ’ ঢোকানো হয় অথবা সরিয়ে দেওয়া হয় অথবা পরিবর্তিত (মডিফাই) বা স্থলাভিষিক্ত করা হয়। এই প্রযুক্তিকে জিনগত পরিবর্তনও বলা হয়। ফলে ডিএনএ ও আরএনএর ‘সিকোয়েন্সিং’ বিষয়টি চলে আসছে। সিকোয়েন্সিং ডিএনএ বলতে খুব সহজভাবে বোঝায়, ডিএনএতে ‘বর্ণমালা’ (নিউকলিয়োটাইডগুলো) কীভাবে বিন্যস্ত রয়েছে, সেটার ক্রম বা পারম্পর্যতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে বিবিধ প্রণালি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘ডিএনএ সিকোয়েন্সিং’ নির্ধারণ করে থাকেন। বিজ্ঞানীরা যখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিএনএর সুনির্দিষ্ট সিকোয়েন্স (বা একটি জিন) নির্ধারণ করেন, তখন সেটির প্যাটেন্টও নেন। বর্তমানে হাজার হাজার ‘জিন প্যাটেন্ট’ রয়েছে। এবং ন্যানো প্রযুক্তির বাণিজ্যও রয়েছে।

অন্যদিকে, আরএনএ সিকোয়েন্সিং টেকনিককে বলা হয় নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (NGS)। এই টেকনিকের সাহায্যে নির্দিষ্ট কোনো জৈব-নমুনায় আরএনএর উপস্থিতি ও পরিমাণ উদ্ঘাটন এবং বিরামহীন পরিবর্তন সংক্রান্ত ‘কোষীয় ট্রান্সক্রিপটোম’ (cellular transcriptome) বিশ্লেষণ করা হয়।

সাধারণত ‘টিকা’কে ব্যবহারোপযোগী করতে অনেক বছর ধরে পরীক্ষার প্রক্রিয়া চালানো হয় এবং দক্ষতার সঙ্গে গণ-উত্পাদনের জন্য অতিরিক্ত কিছুটা সময় লাগে। এ পর্যন্ত একমাত্র অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনিকা টিকা বানাতে যে ‘জেনিটিক সিকোয়েন্স’ ব্যবহার করেছে, তার জন্য শিম্পাঞ্জির অ্যাডেনোভাইরাসের কাছে তারা ঋণী। মডার্না, ফাইজার, নোভাভ্যাক্স, ইনোভায়ো প্রভৃতি টিকা বানাতে কোনো পার্থিব ভাইরাসের কাছে ঋণী নয়। ‘এ-টু-জেড’ সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ল্যাবে সব তৈরি হচ্ছে, অর্থাত্ এটি সিনথেটিক টিকা। এখনো নতুন ও পরীক্ষাধীন প্ল্যাটফরমে বানানো ‘মেসেঞ্জার আরএনএ’ টিকার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে নিশ্চিত নয় বলেই কোম্পানিগুলো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত তথা টিকা ইনজুরির খেসারতির কোনো দায়দায়িত্ব নেয়নি। বিষয়টি বুঝে দেখার দায়দায়িত্ব স্বয়ং গ্রহীতাকেই নিতে হচ্ছে।

লেখক: বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক

ইত্তেফাক/এমআর