বঙ্গবন্ধুর গ্রন্থাগার ভাবনা

৫ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস-২০২১’। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে এবারের প্রতিপাদ্য ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, ঘরে ঘরে গ্রন্থাগার’। এ বছর জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের প্রেক্ষাপট বিগত বছরগুলো থেকে আলাদা। এর দুটো কারণ রয়েছে। প্রথমটি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, দ্বিতীয়টি বৈশ্বিক করোনা ভাইরাস। একদিকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী চলছে নানান আয়োজন। অন্যদিকে করোনা অতিমারির কারণে সরকার জনসমাগম এড়াতে অনেকটা কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। তার একক নেতৃত্বে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বভাবগতই দেশের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে তার চিন্তা ছিল সুগভীর। বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনায় যতগুলো বিষয় অগ্রাধিকার পেয়েছে, এর মধ্যে শিক্ষা উল্লেখযোগ্য। তিনি জানতেন সঠিকভাবে রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত হচ্ছে জাতি-মানস গঠন। আর জাতি-মানস গঠনের পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষা। তিনি মানতেন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হূিপণ্ড হচ্ছে গ্রন্থাগার। তাই তার কাছে গ্রন্থাগারের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুর গ্রন্থাগার ভাবনা মূলত তার শিক্ষাভাবনার মধ্যেই অন্তর্নিহিত।

গ্রন্থাগার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হূিপণ্ডস্বরূপ। এ কথার তাত্পর্য অনুধাবন করতেন বলেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য থাকাকালীন ৫ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম ঢাকায় পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তত্কালীন গভর্নর। বঙ্গবন্ধু সেই কেবিনেটের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপনে জোরালো ভূমিকা রাখেন, যা আজ ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আছে। ২০১৮ সালে এই দিনকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে স্বীকৃতিদানের মাধ্যমে গ্রন্থাগারবান্ধব বঙ্গবন্ধুর ন্যায় তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের আত্মমর্যাদা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিলেন। নিজেকে প্রমাণ করলেন গ্রন্থাগারবান্ধব একজন জ্ঞানপিপাসু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। 

ভারতীয় উপমহাদেশে গ্রন্থাগারবিজ্ঞানের জনক রঙ্গনাথন বলেছেন, ‘গ্রন্থাগার একটি ক্রমবর্ধিষ্ণু উপাঙ্গ’। অর্থাত্, এটি মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের ন্যায় ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ঠিক রঙ্গনাথনের সেই কথারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন গঠিত ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা পুরোটাই প্রতিফলিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনায় গ্রন্থাগার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বঙ্গবন্ধু গঠিত ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘...দেশের প্রতিটি থানা সদরে একটি করে গণগ্রন্থাগার স্থাপন করতে হবে। প্রাথমিক স্কুলে বই পরিবেশন এ গ্রন্থাগারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে। থানা গ্রন্থাগার স্থাপনের ব্যয়ভার বহন করবে জাতীয় সরকার। আমাদের জাতীয় লক্ষ্য হতে হবে দেশের প্রতিটি প্রাথমিক স্কুলে গ্রন্থাগার স্থাপন।’ কলেজ গ্রন্থাগারের উন্নয়নের ন্যূনতম মান সম্বন্ধে কমিশনের সুপারিশ ছিল, ‘কলেজ গ্রন্থাগারের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ অপরিহার্য। কলেজ গ্রন্থাগার সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।’ কমিশন আরো বলেছিল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বই, সাময়িকীর বরাদ্দ বাড়াতে হবে, গবেষণাকর্মকে জোরদার করার জন্য রেফারেন্স বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে এবং বিদেশি বই, ফিল্ম ইত্যাদি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারি আনুকূল্যের প্রয়োজন হবে।’

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে গৃহীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গ্রন্থাগারের উন্নয়নে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করেন।  দুর্ভাগ্য এই জাতির। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে রূপ লাভ করার আগেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনাকে পুনরায় কার্যকরের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার সরকারের আমলেই স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারিকের আশাতীত পদ সৃষ্টি হয়। তিনি গ্রন্থাগারিকের মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধি করেছেন। পেশার মর্যাদা বৃদ্ধিতে ৫ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস’ পালনের ঘোঘণা দিয়েছেন। এ সরকারের আমলেই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর মাধ্যমে এ পদের চাহিদা বর্তমানে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সভ্যতার পরিক্রমায় মানুষের চর্চিত চিন্তাচেতনা, জ্ঞানবিজ্ঞান, মনন-দর্শনের একমাত্র আধার ‘গ্রন্থাগার’ হচ্ছে জাতির সঠিক আলোর দিশারি। বঙ্গবন্ধু ও তার সুযোগ্য কন্যার এই গ্রন্থাগারভাবনা আগামী দিনের পথ চলায় আলো ছড়াবে। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে এ ভাবনা জাতিকে পথ দেখাবে। 

n লেখক : ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়