সাতক্ষীরায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা

সাবেক এমপিসহ ৫০ আসামির কারাদণ্ড

সাতক্ষীরার কলারোয়ায় তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা মামলায় সাবেক এমপি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ তিন জনের বিভিন্ন ধারায় সর্বোচ্চ ১০ বছর, এক আসামির ৯ বছর ও বাকি ৪৬ আসামিকে সাড়ে ৪ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। সাতক্ষীরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হুমায়ুন কবীর গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ১২ মিনিটে জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা শুরু করেন এবং ১০ টা ২১ মিনিটে শেষ করেন। ঘটনার দীর্ঘ ১৯ বছর পর এই মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হলো। রায় ঘোষণার সময় সাবেক এমপি হাবিবসহ ৩৪ জন আসামি আদালতে হাজির ছিলেন।

আদালতে উপস্থিত সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন—আশরাফ হোসেন, নজরুল ইসলাম, মো. আব্দুর রাজ্জাক, শেখ তামিম আজাদ মেরিন, মো. আব্দুর রকিব মোল্ল্যা, মো. আক্তারুল ইসলাম, মো. আব্দুল মজিদ, মো. হাসান আলী, ময়না, মো. আব্দুস সাত্তার, তোফাজ্জেল হোসেন সেন্টু, মো. জহুরুল ইসলাম, গোলাম রসুল, অ্যাডভোকেট মো. আব্দুস সাত্তার, আব্দুস সামাদ, মো. আলতাফ হোসেন, শাহাবুদ্দিন, মো. সাহেব আলী, সিরাজুল ইসলাম, রকিব, ট্রলি শহীদুল, মো. মনিরুল ইসলাম, শেখ কামরুল ইসলাম, ইয়াছিন আলী, শেলী, শাহিনুর রহমান, দিদার মোড়ল, সোহাগ হোসেন, মাহাফুজুর মোল্লা, আব্দুল গফফার গাজী, রিঙ্কু, অ্যাডভোকেট মো. আব্দুস সামাদ ও টাইগার খোকন ওরফে বেড়ে খোকন।

এছাড়া পলাতক যে ১৬ জনের সাজা হয়েছে তারা হলেন— আব্দুল কাদের বাচ্চু, মফিজুল ইসলাম, মো. আলাউদ্দিন, খালেদ মঞ্জুর রোমেল, আরিফুর রহমান, রিপন, ইয়াছিন আলী, রবিউল ইসলাম, মাজাহারুল ইসলাম, আব্দুল খালেক, আব্দুর রব, সঞ্জু, নাজমুল হোসেন, জাবিদ রায়হান লাকী, কণক ও মো. মাহাফুজুর রহমান।

এদের মধ্যে সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিব, আরিফুর রহমান আরিফ ও রিপনকে ১০ বছর, কলারোয়া উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের বাচ্চুকে ৯ বছর ও বাকি ৪৬ আসামিকে বিভিন্ন ধারায় সাড়ে চার বছর থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলা পরিচালনা করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম মুনির, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জী, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শাহীন মৃধা ও সাতক্ষীরার পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুল লতিফ, অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম পিন্টু প্রমুখ। আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট শাহানারা আক্তার বকুল, অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ, অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান পিন্টু, অ্যাডভোকেট তোজাম্মেল হোসেন প্রমুখ।

রায়ের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট শাহানারা আক্তার বকুল বলেন, এই রায়ে আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। আমরা উচ্চ আদালতে যাব। আশা করি উচ্চ আদালত অবশ্যই আমাদেরকে ন্যায়বিচার দিবেন।

আসামিপক্ষের অপর আইনজীবী সাতক্ষীরা জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট আব্দুুল মজিদ বলেন, এই মামলায় ১১টি সেকশনে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। মামলার বিচারে ছয়টি সেকশনে বিভিন্ন ধারায় আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন আদালত। মামলার বিচার কার্যক্রমের আগে থেকে ১১ জন আসামি পলাতক ছিলেন। পাঁচ জন আসামি বিচার শুরুর পর পালিয়ে যান। রায়ের কপি পেলে আমরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এই রায়ের ফলে সাতক্ষীরা তথা দেশ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। রায়ে আমরা খুশি।’ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম মুনির বলেন, ঘটনার দিন বিএনপির সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিবের পরামর্শে ও নির্দেশে প্রায় ৪০০/৫০০ নেতাকর্মী ও বিএনপির সন্ত্রাসীরা গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছিল। এই রায়ের মাধ্যমে সাতক্ষীরার জনগণ কলঙ্কমুক্ত হলো। কাউকে খালাস দেওয়া হয়নি। আজকে এই রায়ে দেশে ন্যায়বিচার কায়েম হলো। এই রায়ে আমরা খুশি।

সাতক্ষীরা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক অমল কুমার রায় জানান, ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে শেখ হাসিনা কলারোয়া উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নের হিজলদি গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে দেখতে আসেন। সেখান থেকে যশোরে ফেরার পথে কলারোয়া উপজেলা বিএনপি অফিসের সামনে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা একটি যাত্রীবাহী বাস রাস্তার ওপরে রেখে তার গাড়িবহরে হামলা চালায়। এতে তত্কালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমানসহ বেশ কয়েক জন আহত হন।

পালটাপালটি মিছিল :এদিকে রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে শহরে আনন্দ মিছিল করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ, যুগ্ম সম্পাদক আ হ ম তারেক উদ্দীন, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী আক্তার হোসেন, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ রায়কে একটি যুগান্তকারী রায় উল্লেখ করে তারা বলেন, ভাবিষ্যতে কোনো বিরোধী দলীয় নেতা যাতে এভাবে আর কোনো হামলার শিকার না হন সেটি এ রায় থেকে সব রাজনৈতিক দলকে শিক্ষা নিতে হবে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা মামলায় হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ ৫০ দলীয় নেতাকর্মীর সাজার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ তারিকুল হাসানের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট চত্বর থেকে বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে তারা শহরের নিউমার্কেট চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এ রায় প্রত্যাখ্যান করে অবিলম্বে নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানান।