রবীন্দ্রসংগীত শেখানোর মানুষ আছে শেখার মানুষ নেই

ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন দেশের গুণী রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী পাপিয়া সরোয়ার। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নিজের সফলতার ঝুড়িতে জমা করেছেন অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। গুণী এই শিল্পী এবার সংগীতে সর্বোচ্চ রাষ্টীয় সম্মান একুশে পদকে ভূষিত হলেন। গানের জগতে দীর্ঘ পথচলা ও সম্মাননাসহ রবীন্দ্রসংগীতের নানা বিষয়ে কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিনের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল

শুরুতে অভিনন্দন জানাচ্ছি সংগীতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার জন্য। প্রথমে কার কাছ থেকে অভিনন্দন পেয়েছেন?

অনেক ধন্যবাদ। হটাত্ করেই দেখলাম একের পর এক আমার মোবাইল বাজছে। অনেকেই এই খবরটি দেওয়ার জন্য কল করছেন। তারপর দেখলাম টিভির স্ক্রলে পুরস্কার পাওয়ার খবরটি দেখানো হচ্ছে। একক কারো কাছ থেকে নয়, অনেকের কাছ থেকেই খবরটি পেয়েছি। এরপর তো সবাই শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। 

দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পূর্ণ সফলতায় আপনি কার কাছে ঋণী? আপনার গুরু বা কোনো সংগীত প্রতিষ্ঠান...

এখানেও একক কারো কাছে আমি ঋণী না। অনেকেই আমার এই পথচলায় সহযোগিতা করেছেন। তাছাড়া আমার পরিবারটিই ছিল একটি সংগীত প্রতিষ্ঠান। আমার মা পিয়ানো বাজিয়ে গান করতেন। আমার বড় বোন গান করতেন, কবিতা লিখতেন। অন্য বোনেরা ও ভাই সংগীত ও কবিতা চর্চা করতেন। ছোটবেলায় তো বড় আপা জোর করে গান শেখাতে বসাতেন।  এরপর ছায়ানটে গান শিখেছি। তার আগে কচি-কাঁচার বিতানে গান শিখেছি। 

কোন সময়টা আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করেন?

আসলে ক্যারিয়ারের এমন সময় আছে বলে আমি জানি না। আমি ছোটবেলা থেকে নিয়মিত গান চর্চার ভেতরে ছিলাম। ক্লাস নাইন থেকেই টেলিভিশন, রেডিওতে গান করি। তখন যদিও রবীন্দ্রসংগীতে অডিশন দেওয়া ছিল, তবে পাকিস্তান আমল ছিল বলে সেটা গাইতে দেওয়া হতো না। আমি আবার অন্য গান পারতাম না। তখন সিনিয়ররা সব গুছিয়ে দিতেন। তাদের কাছ থেকে শিখতাম। সেগুলো আমার ক্যারিয়ারে অনেক অবদান রেখেছে।

অনেকেই বলেন রবীন্দ্রসংগীতের রক্ষণশীলতা কমাতে হবে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য শুনতে চাই—

হ্যাঁ, কমানো যেতেই পারে, তবে রবীন্দ্রসংগীতের স্বকীয়তা নষ্ট করে না। কবিগুরু একটা সুর দিয়ে গেছেন, সেটাকে তো আমরা পাল্টাতে পারি না। কারণ উনি একটা সুর দিয়ে গেছেন, সেটা পাল্টানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। দেখুন, শান্তিনিকেতনে যেমন ভুল সুরে না গেয়ে সঠিক সুরে রাস্তা দিয়ে হেঁটেই রবীন্দ্রসংগীত সবাই গেয়ে যাচ্ছে, এমন কিন্তু এখানে পাই না। এখানেও তেমন করা যেতে পারে, তবে শুদ্ধ সুরে। 

দেশের সংগীতে নারী রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী যথেষ্ট রয়েছে। কিন্ত পুরুষ রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সাদি মোহাম্মদ ও কাদেরী কিবরিয়ার পর তেমন কেউ তারকা হয়ে ওঠেনি। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য শুনতে চাই—

এটা তো আসলে চর্চার ওপর নির্ভর করে। মেয়েদের কণ্ঠও ভালো, ছেলেদের কণ্ঠও ভালো। তবে এখানে মূল যেটা দরকার সেটা হলো প্রাণ দিয়ে গাইতে হবে। সাজুগুজু করে এলেই কিন্তু শ্রোতার গ্রহণ করবে এমন না, গানটি মানুষকে ছুঁয়ে যেতে হবে। আমার মনে হয় ছেলেদের চর্চাটা একটু বেশি করতে হবে। তারা গানে সময় কম দিতে চায়। এখন আসলে রবীন্দ্রসংগীত শেখানোর মানুষ আছে কিন্তু শেখার মানুষ নেই।

রবীন্দ্রসংগীতের দুই গুণী শিল্পী সাদি মোহাম্মদ ও কাদেরী কিবরিয়ার সঙ্গে অগণিত কাজ করেছেন। তাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভাই-বোনের মতো। কাদেরীর সঙ্গে দেশ স্বাধীনের আগে থেকেই কাজ করেছি। আর সাদির সঙ্গে শান্তিনিকেতন যাওয়ার পর থেকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেও কাদেরীর সঙ্গে একটি কোরাস গান ছিল লাকী আখান্দের সুরে। কাদেরী বাইরে চলে গেলে সাদির সঙ্গে নিয়মিত কাজ করা শুরু হয়। এরা আসলে আমার ভাই, বন্ধু যেটাই বলেন। এই যেমন গতকাল বারবার তারা কল দিচ্ছে। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম তোমরা কেন আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছো না। অনেক বকাবকি করলাম। এমন মজার সম্পর্ক তাদের সঙ্গে।

সাউন্ডটেকের সঙ্গে কন্টাক্টে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন, এখন তো সেটা আমরা ভাবতেই পারি না। সে সময়ের কথা জানতে চাচ্ছি—

তখনো আমি খুব বেশি কাজ করতাম না। কারণ তারা নিজেরা একটা লিস্ট করে নিয়ে আসতো, সেগুলো গাইতে হতো। কিন্তু আমি অনেক চুজি ছিলাম। আমি আসলে যে গানগুলো পছন্দ করতাম যেগুলো গাইতাম। যদিও তারা ব্যবসায়িক হিসেব করেই সেটা করতো। তাই আমার অ্যালবামও কম। তাছাড়া রয়ালিটিও দেওয়ার কথা বলে দেয় না। শুধু তখন নয়, এখনো গানের শিল্পীদের অবস্থা খুবই নাজুক।

পেশা হিসেবে রবীন্দ্রসংগীতকে বেছে নেওয়া যায় কি-না? আপনি একজন সফল রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

যদিও আমি পেশা হিসেবে রবীন্দ্রসংগীতকে নিইনি। তবে হ্যাঁ, শুধু এখন না, আগেও রবীন্দ্রসংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো অবস্থা আছে বা ছিল। পেশা হিসেবে রবীন্দ্রসংগীতকে নিয়ে অনেকেই তো বেঁচে আছেন, বাঁচা তো যায়। ভালো করে শিখে বা শেখার পাশাপাশি গাইবো, এমন মনোভাবে এগিয়ে গেলে নিশ্চয় ভালো অবস্থানে যাওয়া সম্ভব।

আপনি ও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা সমসাময়িক, দু’জনেরই তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ঈষার কোনো গল্প আছে কি-না? ওনার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন শুনতে চাই—

হা হা হা। আমাদের মধ্যে এমন কোনো সম্পর্ক নেই। রেজওয়ানা আমার ৩ বছর পর শান্তিনিকেতনে যায়। আমরা একই গুরুদের সংস্পর্শে থেকেছি। আর রেজওয়ানা খুবই পরিশ্রমী। ও অনেক পরিকল্পনা করে কাজ করে। শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, নিজের সংগীত প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য কাজও অনেক সাজিয়ে গুছিয়ে করে। এ জন্যই রেজওয়ানা সফল একজন মানুষ।

দেশে এখন রবীন্দ্রসংগীত ফিউশন করে গাওয়া হচ্ছে। এতে মূল রবীন্দ্রসংগীতের স্বকীয়তা কতটা বজায় থাকছে?

আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা পছন্দ করি না। বাজনা ব্যবহার করা যেতেই পারে, কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের স্বকীয়তা বজায় রেখে করতে হবে। স্বকীয়তা বজায় না থাকলে সেটা গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না।