‘আমি আছি, আমি থাকিব’

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলিয়াছিলেন—‘আমারে দেব না ভুলিতে’। আর এইবার গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবসে বলা হইয়াছে, ‘আই অ্যাম, আই উইল বি।’ অর্থাত্—আমি আছি, আমি থাকিব। প্রকৃত অর্থে, ক্যানসার কতখানি জীবনহন্তারক অসুখ এবং একটি পরিবারে তাহা কী ভয়াবহ বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতে পারে—তৃতীয় বিশ্বের ভুক্তভোগীরা ইহা সকলের চাইতে নির্মমভাবে উপলব্ধি করিতে পারেন। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই উপমহাদেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে শতকরা ১০ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হইয়া থাকেন। আশঙ্কা করা হইতেছে, ২০৫০ সালে ইহা বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়াইবে ১৬ শতাংশে। দেখা গিয়াছে, ৬৫ বত্সরের ঊর্ধ্বে ক্যানসারের ঝুঁকি কম বয়সিদের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে, ক্যানসার নির্ণয়ের পর মাত্র ৩০ শতাংশ রোগী পাঁচ বত্সরের অধিক সময় বাঁচিতে পারেন। অথচ প্রাথমিক স্তরে ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব হইলে প্রচলিত আধুনিক চিকিত্সায় বহু ক্ষেত্রেই ক্যানসার নিরাময় সম্ভব। এমনকি চূড়ান্ত স্তরের কয়েক ধাপ পূর্বেও ক্যানসার ধরা পড়িলে রোগটিকে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই জন্যই প্রাথমিক স্তরে যথাযথভাবে ক্যানসার শনাক্তকরণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে ক্যানসার হয়, ইহার শরীরের অন্দরে অনুসন্ধান করিয়া বিজ্ঞানীরা যাহা অনুধাবন করিতে পারিয়াছেন, তাহা সংক্ষেপে এইভাবে বলা যায়—ক্যানসার সৃষ্টির নেপথ্যে রহিয়াছে আমাদের কোষের অস্বাভাবিক আচরণ। কোটি কোটি কোষের সমন্বয়ে মানবদেহ গঠিত। এই কোষের কেন্দ্র হইল নিউক্লিয়াস, যাহার ভিতরে থাকে ক্রোমোজোম। জিন থাকে ক্রোমোজোমের মধ্যে এবং ডিএনএ থাকে জিনের মধ্যে। প্রয়োজন অনুযায়ী কোষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে যেই জিনগুলি বিশেষ ভূমিকা পালন করে, তাহার মধ্যে একটি জিন প্রটোঅনকোজিন। এই প্রটোঅনকোজিন ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ, যেমন—ভাইরাস, রাসায়নিক পদার্থ (কার্সিনোজেন) ইত্যাদি দ্বারা আক্রান্ত হইয়া অনকোজিনে রূপান্তরিত হয় এবং তখন সেই কোষের বৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলিতে থাকে। আবার অপ্রয়োজনীয় কোষ সৃষ্টিতে বাধাদানকারী আরেক ধরনের জিন রহিয়াছে, যাহার নাম ক্যানসার সাপ্রেসর জিন। এই সাপ্রেসর জিনের কার্যকারিতাও যদি কখনো নিষ্ক্রিয় হইয়া যায়, তখন ক্যানসার সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দেয়। সুতরাং বুঝাই যাইতেছে, কার্সিনোজেন পদার্থ আমাদের জন্য কতখানি বিপজ্জনক। এই ধরনের পদার্থ কিন্তু ভেজাল খাবারে সবচাইতে বেশি থাকে। এই কারণে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, জিনগত কারণ ব্যতীত খাদ্যগত কারণে আমাদের দেশে ক্যানসারের নেপথ্যে রহিয়াছে ভেজাল খাবারের প্রাদুর্ভাব। ইতিপূর্বে দেখা গিয়াছে, ঢাকার বাজারে প্রাপ্ত সকল ধরনের খাদ্যের মধ্যে ন্যূনতম ৪০ শতাংশই বিষাক্ত। ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষায় এই বিষের পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ডের বিচারে তিন হইতে ২০ গুণ অধিক। খাদ্যের নমুনা পরীক্ষায় পাওয়া যায় ডিডিটি, ক্লোরডেন, হেপটাক্লোর জাতীয় ভয়াবহ কীটনাশক। ফরমালিনের ব্যবহারও নানান ক্ষেত্রে ব্যাপক। বিজ্ঞানীরা ফরমালিনকে ক্যানসার সৃষ্টিকারক হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছেন বহু পূর্বেই। আপাতভাবে ক্যানসারকে আধুনিক সময়ের যাপিত জীবনের ফল বলিয়া মনে করা হইলেও এই ব্যাধির বহু প্রাচীন আলামত উদ্ধার হইয়াছে। মানুষের নিকট পূর্বপুরুষ হিসাবে খ্যাত বিলুপ্ত নিয়ানডারথালদের শরীরেও ক্যানসারের চিহ্ন মিলিবার কথা শুনা গিয়াছে। এই জন্য বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণে ক্যানসার হয় না। ইহার সৃষ্টিতে একাধিক কারণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকিলেও প্রধানত বংশগত ও পরিবেশগত কারণকেই দায়ী করা হয়। সুতরাং ক্যানসার এখনো অনেকাংশে রহস্যের অবগুণ্ঠনে রহিয়াছে।

আমাদের দেশে ক্যানসার আক্রান্তের সবচাইতে বড় বিপদ হইল—ইহার যতটুকু চিকিত্সা এখন করা সম্ভব, তাহা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দ্বিতীয়ত, ক্যানসার শব্দটি মৃত্যুদূততুল্য। তাই কেহ এই রোগে আক্রান্ত হইলে তাহার পরিবারটির উপর যেন ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের আকাশ ভাঙিয়া পড়ে। এই কারণে, ক্যানসার সৃষ্টির সম্ভাব্য অনুঘটকগুলিকে সমীহ করিতেই হবে। জীবনযাপনেও তাহার প্রতিচ্ছাপ রাখা দরকার।