খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিজমি সংরক্ষণ

খাদ্যনিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত। বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি উন্নয়নের টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে খাদ্যনিরাপত্তা বিধান উত্পাদনশীল জমির পর্যাপ্ততার ওপর নির্ভর করে। দেশে প্রতিদিন গড়ে ২২০ হেক্টর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমহ্রাসমান জমির দেশে কৃষিজমি এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতে উত্পাদনশীল এক টুকরা কৃষিজমিও অনুত্পাদনশীল খাতে যাওয়া উচিত নয়। কৃষিজমির অন্যবিধ ব্যবহার অচিরেই বন্ধ করা না হলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের ২৫ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য উত্পাদনের পর্যাপ্ত জমি অবশিষ্ট থাকবে না। কৃষিজমি সুরক্ষার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত কৃষিজমি রক্ষার স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হয়নি।

কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন নামে বহুল প্রত্যাশিত আইনটি গত এক দশক ধরে খসড়া পর্যায়ে আছে। কৃষিজমি সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেশের ভবিষ্যত্ খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। উর্বরতা ও ফসল উত্পাদনের ভিত্তিতে কৃষিজমির শ্রেণি বিভাগ করে চিহ্নিত কৃষিজমি শুধু ফসল ফলানোর কাজেই ব্যবহার করা যাবে মর্মে নির্দেশনা জারি করা প্রয়োজন। কৃষিজমির মালিকানা হস্তান্তর, কেনাবেচায় কৃষি বিভাগের প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করলে প্রকৃত কৃষিজমি সুরক্ষা এবং কৃষিজমিতে অকৃষি কার্যক্রম বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, ইটভাটা কৃষিজমি বিনষ্টের অন্যতম কারণ। ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ মোতাবেক দুই-ফসলি বা তিন-ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না বলা হলেও দেখা যায় কৃষিজমিতে অনেক ইটভাটা গড়ে উঠছে। ইটভাটা অনুমোদনের প্রাথমিক পর্যায়ে জমি ফসলি জমি কি না প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে; ভাটা স্থাপন করার পর অথবা মাঝপথে নয়। ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ সংশোধন করে কৃষিজমি সুরক্ষার বাস্তব উদ্যেগ নেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, কৃষিজমির পাশে ইটভাটায় জমির মালিকরা নগদ লাভের আশায় ফসল চাষ না করে পার্শ্ববর্তী ইটভাটায় মাটি বিক্রি করে দেন; মাটির উপরিভাগের ৩০ সেন্টিমিটার ফসল চাষের উপযোগী; মাটির ওপরের স্তর চলে গেলে সে মাটি আর চাষযোগ্য থাকে না। প্রস্তাবিত কৃষিজমি সুরক্ষা আইনে বিষয়টির প্রতিকারে সুনির্দিষ্ট ধারা ‘চিহ্নিত কৃষিজমির মাটি বিক্রি করা যাবে না’ যোগ করা প্রয়োজন।

খাদ্যের সংকুলান থাকলে শিক্ষা স্বাস্থ্য আইন-শৃংখলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সবই অক্ষুণ্ন থাকে। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক মহামন্দা চলাকালে খাদ্য সংকটের কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আইন-শৃংখলার চরম অবনতি মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল। টেকসই খাদ্য উত্পাদন নিশ্চিত করা না গেলে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে আমদানিকৃত খাদ্যের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে তিনবেলা খাবার জোগানো কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্ব খাদ্য বাজার চরম অনিশ্চিত একটি বাজার—যেখানে সংকটকালীন কিংবা নিজ দেশের প্রয়োজনে অথবা কূটনীতির মারপ্যাঁচে রপ্তানিকারক দেশ যখন তখন খাদ্যপণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হয়, সে সময় বহুগুণ বেশি টাকা দিয়েও খাদ্যপণ্য কেনা যায় না। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে খাদ্য উত্পাদনে নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ, বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য নিয়ে ঘোলাটে রাজনীতি প্রভৃতি কারণে দেশের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিজস্ব উত্পাদনের মাধ্যমে ধারাবাহিক স্বয়ংস্বম্পূর্ণতা অর্জনের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজস্ব উত্পাদনের মাধ্যমে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে কৃষিজমি সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতি ইঞ্চি কৃষিজমির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষিজমি সুরক্ষায় অবিলম্বে কঠোর আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ঢাকা