সড়কে প্রতিদিনই ঝরছে তাজা প্রাণ। খালি হচ্ছে মায়ের বুক। হাজার হাজার পরিবার পথে বসছে। আর প্রিয়জন হারানোর কষ্টের কোনো বর্ণনা হয় না। যে হারায় কেবল সেই বোঝে। অদক্ষ চালক, মাদকাসক্ত চালকদের যানবাহন চালানো, লক্কড় ঝক্কড় যানবাহন, ঢিলেঢালা টু্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আগে যাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা, নিয়ম না মেনে ওভারটেকিং, যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, পেছনের বাসকে সামনে আসতে না দেওয়ার প্রতিযোগিতা, সড়কে খানাখন্দ, সড়কের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় গতিসীমা না মানার কারণে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আবার অনেকে চিরতরে পঙ্গু হচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। তাদের দেখার কেউ নাই। গতকাল শুক্রবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে কাঁচপুর থানার কাছে যাত্রীবাহী দুই বাসের রেষারেষিতে এক বাসের ধাক্কায় তিন পথচারী নিহত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সড়ক নিত্যদিন জীবন কেড়ে নিচ্ছে। নেই কোন প্রতিকার। নিয়ন্ত্রণও করা যাচ্ছে না। এর থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?
হাইওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু হাইওয়ে পুলিশকে দায়ী করলে ঠিক হবে না। জনবল ও যানবাহন সংকটের কারণে বিপাকে রয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। সারাদেশে ৬৪ জেলার মধ্যে ৪২টি হাইওয়ে পুলিশের অধীনে। ২০০৫ সালে হাইওয়ে পুলিশ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। শুরুতেই ছিল ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মতো হাইওয়ে পুলিশের অবস্থা। বর্তমান সরকারের আমলে যানবাহন ও জনবল বৃদ্ধি করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা অতি নগণ্য। আবার এক শ্রেণীর হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রাস্তায় থাকেন না তারা। নছিমন-করিমনসহ অবৈধ যানবাহনগুলো টাকার বিনিময়ে হাইওয়েতে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়। আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। এদিকে অনেক গাড়ির মালিক প্রভাবশালী। কেউ কেউ আছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতা। এসব গাড়ির ড্রাইভাররা বেশি বেপরোয়া আচরণ করে থাকে। কিছু ড্রাইভারের ভাবখানা এমন যে, সড়কে মানুষ মারার লাইসেন্স তাদের দেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র আব্দুল করিম রাজিব নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী। ওই ঘটনার পর ছাত্র বিক্ষোভে অনেকটাই অচল হয়ে পড়ে গোটাদেশ। টানা তিন দিন দেশের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ছিল শিক্ষার্থীদের হাতে। টানা এক সপ্তাহ অচল ছিল গোটা দেশের পরিবহন ব্যবস্থাপনা। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য নানা উদ্যোগের আশ্বাসের পর শিক্ষার্থীরা ঘরে ফেরে। তবে এর পরও সড়কে শৃঙ্খলা পুরোপুরি ফেরেনি। এজন্য প্রতিদিনই সড়ক মহাসড়কে যানবাহনের চাপায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। অতীতে সড়ক-মহা্সড়কে দুর্ঘটনা রোধে বহু সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু কোনটার বাস্তবায়ন হয়নি। তবে বেড়েছে যানবাহনে চাঁদাবাজির রেট। নিয়ম কানুন না মানার প্রতিযোগিতা।
অতিরিক্ত আইজিপি (হাইওয়ে) মল্লিক ফখরুল ইসলাম বলেন, হাইওয়ে পুলিশে জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বলেন, হাইওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ পিছন থেকে ধাক্কা দেওয়া। আর সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সড়ক দুর্ঘটনার সবগুলো কারণ চিহ্নিত করে তা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২২৫০ জন ড্রাইভারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আরো ৫০০০ ড্রাইভারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেন, চালকদের আইন না মানার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের মানসিকতা। নগর-মহানগরীর রাস্তা এবং হাইওয়েগুলোয় ট্রাফিক সিগন্যালের বালাই নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত ট্রাফিক সার্জন বা পুলিশ গাড়ির সামনে গিয়ে না দাঁড়ান চালকরা তাদের গাড়ি থামানোর কোন প্রয়োজনই মনে করে না। ট্রাফিক সিগন্যাল চালু না থাকায় চালকদের এই মানসিকতা তৈরি হয়েছে। অথচ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কোন চালক ট্রাফিক আইন ভঙ্গের চিন্তা করে না। এ কারণেই চালকদের আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। আইন অমান্যকারীকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবেই চালকদের শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব হবে।
ইত্তেফাক/এমএএম