১৯৭২ সালে জো বাইডেন প্রথমবারের মতো সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার কিছু দিন পর ইসরায়েল সফরে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ‘মধ্যপ্রাচ্যে যদি ইসরায়েল নামে কোনো দেশ না থাকত তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনে একটি ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হতো’। জো বাইডেন তখন ছিলেন ২৯ বছর বয়সি একজন তরুণ সিনেটর এরপর কেটে গেছে ৪৯ বছর। অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু ইসরায়েলি দখলদারিত্বের খড়গহস্ত থেকে ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি আসেনি। জো বাইডেন এখন তার ২৯ বছরের তরুণ সিনেটর নন বরং একজন বর্ষীয়ান সফল রাজনীতিবিদ হিসেবে শপথ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম রাষ্ট্রপতির। পরপর চারটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবদের ব্যর্থতা এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট নিরসন এবং স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রগঠনে যুদ্ধ নয় বরং আলোচনার টেবিলই একমাত্র সমাধান।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, ইসরায়েলকে টিকিয়ে রাখা এবং আজকের ইসরায়েল রাষ্ট্রের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বড় অনুঘটক এটা খুব সহজেই অনুমেয়। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেননি বা গৃহীত পদক্ষেপগুলো সফল হয়নি। কিন্তু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে কখনোই অস্বীকার করেনি। ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা করার জন্য এক সময় আরবদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজকের বাস্তবতায় আরবদের অনৈক্যই ফিলিস্তিনি স্বাধিকার আন্দোলনকে জোরালো তো করছেই না বরং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে আরবদের মধ্যে আর তেমন মাথাব্যথা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
সদ্য সাবেক হওয়া মার্কিন রাষ্ট্রপতির শাসনামলে ইসরায়েলিদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ একদিকে যেমন শান্তি প্রক্রিয়াকে অনেক দূরে পিছিয়ে নিয়ে গেছে একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতাও হ্রাস পেয়েছে। প্রথা ভেঙে ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেলআবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে আনার ঘোষণার পরই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছিল তারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে আর মানবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের জন্য অর্থসহায়তাও হ্রাস করেছিলেন। তার ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আলোর মুখ দেখতে না পারলেও তিনি তথাকথিত শান্তির দ্বারা ফিলিস্তিনিদেরকে একটি অধীনতামূলক রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করেছিলেন। ক্ষমতার শেষ দিকে এসে তিনি কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ডোনাল্ট ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বৈধতা দান এবং দখলকৃত এলাকায় বসতি নির্মাণের পক্ষে প্রকাশ্যেই সওয়াল গেয়েছেন। ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাত মূলক আচরণ যেমন বৈশ্বিকভাবেও নিন্দিত হয়েছে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও তার পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের বিরুদ্ধে অনেক রাজনীতিবিদও সোচ্চার ছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার তথাকথিত ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ সফল করতে না পারলেও দুটি বিষয়ে তিনি সফল হয়েছেন। প্রথমত, ইসরায়েলি অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিয়ে তিনি ইসরায়েলকে আরো বেশি আগ্রাসি হতে উত্সাহিত করেছেন। দ্বিতীয়ত, আরব ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে দিতে পেরেছেন। এক সময় ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো রকম সম্পর্কে না যাওয়ার বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ ছিল আরবরা। এখন আরব দেশগুলো ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায় হওয়ার আগেই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কে যাওয়া-না-যাওয়া নিয়ে বহুধাবিভক্ত।
বাইডেন প্রশাসনের কার্যক্রমকে গতিশীল এবং ফলপ্রসূ করতে ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে যেমন ঐক্য দরকার একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার। ২০০৬ সালের পর থেকে গাজা এবং পশ্চিম তীর কার্যত বিচ্ছিন্ন দুটি অঞ্চল হামাস এবং ফাতাহ দুই অঞ্চল শাসন করছে। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২০০৭ সালে হামাসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ভেঙে দেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। তথাপিও গাজায় হামাসের শাসন বহাল থাকে এবং হামাস এ অঞ্চল থেকে ফাতাহকে বের করে দেয়। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর ২০১৪ সালে গোষ্ঠী দুটির মধ্য ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু তারপর দল দুটির মধ্যে বিরোধ পুরাপুরি কাটেনি। এত দিনে কোনো নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়নি। ইতিমধ্যে যে চারটি আরব দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে সেখানে ফিলিস্তিনিদের দাবি-দাওয়া জোরালো নয়। জো বাইডেন ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ে একটি দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধান তিনি চান। তার এই চাওয়াটাকে এগিয়ে নিতে আরবদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এক এক করে বিচ্ছিন্নভাবে যদি আরবরা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে থাকে, এতে একদিকে আরব ঐক্যে ফাটল ধরবে একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আরো বিলম্বিত এবং কঠিন হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়