একান্নবর্তী পরিবার হারিয়ে যাচ্ছে

সভ্যতার আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে সমাজ। এই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে আমাদের সংস্কৃতিতেও। আকাশসংস্কৃতির প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে একান্নবর্তী পরিবার, যা ছিল বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কিন্তু বর্তমানে মানুষগুলো কেমন স্বার্থপর, হাতাশাগ্রস্ত আর বস্তুবাদী বিশ্বের পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্তপ্রায়। তাতে ওড়ে না কোনো সুখ, নেই মায়া-মমতা, আর প্রেম-ভালোবাসা। একক পরিবারের কালো থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। দুরন্ত শৈশব আজ আটকে গেছে বারান্দার গ্রিলে।

একান্নবর্তী তথা যৌথ পরিবার এখন গল্পের মতো। যে গল্পের বটবৃক্ষ ছিলেন দাদা। দাদা ছিলেন কর্তা। তিনি পরিবারকে আগলে রাখতেন। যে গল্পে একসঙ্গে বসবাস করত দাদা-দাদি, নাতি-নাতনি, চাচা-চাচি, ভাইবোন, মা-বাবা তথা পরিবারের সবাই। আর দাদা-দাদি ছিলেন নাতি-নাতনিদের গল্পকথক। দাদি ছিলেন পরিবারের কর্ত্রী, যিনি পুত্রবধূদের পরিচালনা, রান্নাবান্না কাজের দায়িত্ব পালন করতেন। নাতি-নাতনিরা দাদির কাছেই লালিত-পালিত হতো। গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্রের মধ্যে ছিল এক ভালোবাসার বন্ধন। বিপদে আপদে সবাই সবাইকে সাহায্য করত নির্দ্বিধায়। পরিবারের ছোট সদস্যরা বড়দের কাছ থেকে নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধের জ্ঞান অর্জন করত। ফলে শিশুদের সহজেই মানসিক বিকাশ ঘটত। গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্র একে অন্যের কাছ থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা গ্রহণ করত, যা তাদের পরবর্তী জীবনের পাথেয় ছিল, যা বর্তমানে নিছক রূপকথার কাহিনি।

একাডেমিক শিক্ষা দিয়ে মানুষ তার নাম সুনাম অর্জন ও ক্যারিয়ার গোছাতে পারে কিন্তু একজন মানুষ নৈতিকতা, মূল্যবোধ, আদব-কায়দা রপ্ত করে মূলত তার পরিবার থেকে। একজন শিশু তার Foundation eduaction পেয়ে থাকে পরিবার থেকে। আদর্শ পরিবারের সন্তান আদর্শবান হবে। শিশু যখন তার হাত-পা নাড়াতে শুরু করে, তখন থেকেই সে পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে শেখা শুরু করে। তাই একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে শিশুকে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাই মূলত অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে।

অথচ বর্তমান পরিবারগুলো ছেঁড়া কাগজের মতো কুচি হয়ে গেছে। নিজ স্বার্থে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। একান্নবর্তী পরিবারের দাদা-দাদি এখন পরিবারে মেহমানের মতো, চাচা-চাচিকে অনেকে চেনেই না, বেশির ভাগ পরিবারে দেখা যায় পিতা-মাতা দুজনই কর্মজীবী, যাতে করে সন্তানকে সময় দেওয়া হয় না পিতা-মাতারও। ফলে শিশুরা তাদের সময় কাটায় মোবাইল গেমিং আর আকাশসংস্কৃতির দুনিয়ায়। যার কারণে শিশুর আর পারিবারিক শিক্ষা গ্রহণ করা হয় না এবং শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে না। কিন্তু বর্তমান বস্তুবাদী দুনিয়ায় পরিবারগুলোর সন্তান আর পরিবারের মধ্যে থাকে দূরত্ব, ফলে সন্তানরা তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে কোনো বিষয় ভাগাভাগি করতে পারে না, যাতে করে শিশুদের মধ্যে একধরনের হতাশা কাজ করে।

মোদ্দা কথা, একান্নবর্তী তথা যৌথ পরিবার না থাকায় আজকের শিশুরা পারিবারিক শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিশুরা তাদের দাদা-দাদি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহচর পাচ্ছে না, যাদের কাছ থেকে তারা নৈতিকতা, আর্দশ ও মূল্যবোধ শিখবে। ফলে তাদের মধ্যে নৈতিকতা মূল্যবোধের অভাব দেখা দিচ্ছে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়