জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের হিসাবে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। যদিও বেসরকারি হিসাবে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭০ লাখেরও বেশি। মাদকসেবীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চিকিত্সকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই একমত যে, দেশে এই মুহূর্তে যে মাদকটি ব্যবহারের শীর্ষে আছে তা হলো ইয়াবা। এর বাইরে হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিল বহুকাল ধরেই এদেশে অনেক মাদকসেবী ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নতুন যে মাদকের নাম শোনা যাচ্ছে তা হলো ‘ক্রিস্টাল মেথ’ বা ‘আইস’। নতুন এই মাদক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৯ সালের ২৭ জুন ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ক্রিস্টাল মেথসহ নাইজেরীয় এক নাগরিককে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ দপ্তর। তাদের ভাষ্য, নিষিদ্ধ ডার্ক নেটের সদস্য হয়ে তিনি মাদক ব্যবসা শুরু করেছেন এবং আফ্রিকা থেকে এনে তিনি এদেশে বিক্রির চেষ্টা করতেন। তার কাছে এ ধরনের ৫২২ গ্রাম মাদক পাওয়া যায়। যদিও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খুরশীদ আলম বলছেন, ক্রিস্টাল মেথের কথা প্রথমে তারা জানতে পারেন ঐ বছরের ফেব্রুয়ারিতে। ২৬ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থেকে তিন জনকে মাদকসহ আটকের পর তাদের কাছে আট গ্রাম আইস পাওয়া যায়। এরপর বিষয়িটি নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান এবং আটককৃতদের জিজ্ঞাসাদে একটি ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে জড়িতরা বিষয়টি স্বীকার করে এবং মূল হোতা বর্তমানে জেলে। তখন এদের ধরা না গেলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পরত।
জিগাতলায় ল্যাব পাওয়ার পর নতুন মাদক আইস বা ক্রিস্টাল মেথ সম্পর্কে তথ্য চেয়ে পাঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, কারখানাটির মালিক হাসিব মোহাম্মদ মুয়াম্মার রশিদ। প্রকৌশলী বাবা ও অধ্যাপক মায়ের সন্তান হাসিব মালয়েশিয়ায় প্রকৌশল বিষয়ে পড়তে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে জিগাতলার ছয়তলা বাড়ির নিচতলায় গবেষণাগারের আদলে কারখানা গড়ে তোলেন। কারখানায় ঢুকতে গেলে পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকতে হতো। অত্যন্ত সুরক্ষিত তার এই কারখানা। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে রশিদকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রসায়নবিদ দুলাল কৃষ্ণ সাহাও অংশ নেন। তিনি বলেন, কারখানা থেকে তারা আইস বা ক্রিস্টাল মেথ ও ইয়াবা তৈরির উপকরণ মিথাইল অ্যামফিটামিন, ক্রিস্টাল মিথাইল অ্যামফিটামিন, এমডিএমএ তৈরির উপকরণ মিথাইল ডাই অক্সিম্যাথা অ্যামফিটামিনসহ ১৩ ধরনের উপকরণ পান। তিনি বলেন, মানবদেহে অতি অল্প সময়ে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এই মাদক। এই মাদক সেবনে মস্তিষ্কের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এ থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এই মাদক সেবনের ফলে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। আইসে শতভাগ এমফিটামিন থাকায় এটা বিশ্ব জুড়েই ভয়ংকর মাদক হিসেবে চিহ্নিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আইস’ লবণের মতো দানাদারজাতীয় মাদক। দেখতে কখনো চিনির মতো, কখনো মিছরির মতো। আইস উচ্চমাত্রার মাদক, যা সেবনের পর মানবদেহে দ্রুত উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এই মাদক সেবনে অনিদ্রা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম ও হূদরোগকে বেগবান করে। এটি মূলত তিনভাবে সেবন করা যায়। প্রথমত, ধূমপান আকারে, কাচের পাইপের দ্বারা তৈরিকৃত বিশেষ পাত্রের মাধ্যমে, যাকে বলা হয় বং। দ্বিতীয়ত, ইনজেক্ট করে এবং তৃতীয়ত, ট্যাবলেট হিসেবে। এই মাদক অতিমূল্যবান। আসক্তদের কাছে ১০ গ্রাম ১ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। অতি বিত্তশালীদের সন্তানেরা এটি ব্যবহার করে থাকে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, আইস মাদকে ক্ষতিকর সবকিছুই আছে। নতুন এই মাদক তরুণ ও যুবসমাজকে ধ্বংস করে দেবে। রাজনৈতিক অঙ্গনকেও ধ্বংস করে দেবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, সবাইকে নতুন মাদক ‘আইস’ নির্মূলে এগিয়ে আসতে হবে এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও বলছেন, ঐ নাইজেরিয়ান নাগরিককে গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে যে ৫২২ গ্রাম আইস পাওয়া যায়, তা দিয়ে অন্তত ১০ লাখ ইয়াবা তৈরি করা যেত।
গত বছরের নভম্বরে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘আইস’ বা ‘ক্রিস্টাল মেথ’সহ ছয় জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খুরশীদ আলম বলেন, রশিদের কাছে ২৯ গ্রাম আইস পাওয়া যায়। পরে রশিদের স্বীকারোক্তিতে আরো কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বলেন, ঐ সময় রশিদকে গ্রেফতার করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারত। এটা ছড়িয়ে পড়তে পারত। ইয়াবার সঙ্গে এই মাদকের তুলনা করে তিনি বলেন, ইয়াবায় এমফিটামিন থাকে পাঁচ ভাগ আর আইসের পুরোটাই এমফিটামিন। ফলে এটি ইয়াবার চেয়েও অনেক গুণ বেশি ক্ষতিকর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দুই বছর ধরে আইস দেশে আসতে শুরু করেছে। গত ৪ নভেম্বরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গেন্ডারিয়া থেকে ছয় জনকে ৬০০ গ্রাম আইসসহ গ্রেফতার করে। গত ১৪ জানুয়ারি হাতিরপুল ও হতিরঝিল এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে আইসসহ চার জনকে গ্রেফতার করে। তাদের মতে, আইস থাইল্যান্ডে বেশি ব্যবহূত হয়। এই মাদকও মিয়ানমার হয়ে আসতে শুরু করেছে। কারণ ইয়াবার সঙ্গে আইসও পাওয়া যাচ্ছে। যদিও মালয়েশিয়া থেকেও এটি আসার প্রমাণ মিলেছে।