উত্পাদন কমে যাওয়ায় বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন এলপি গ্যাস লিমিটেড আর্থিক সংকটে পড়েছে। দৈনিক ৭/৮ হাজার সিলিন্ডার থেকে কমে বর্তমানে ৪ হাজার সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহ দিতে পাচ্ছে। প্রায় চার মাস যাবত্ সিলেটের কৈলাশটিলায় অবস্থিত এলপিজি প্ল্যান্টের উত্পাদন বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিপিসির দুটি এলপিজি প্ল্যান্টে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতাসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয় হয়।
এদিকে বিপিসির এলপি গ্যাস লিমিটেড থেকে টাকা নিয়ে দেশের এলপিজি খাত উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই টাকা দিয়ে একটি ক্রস সাবসিডি ফান্ড তৈরি করা হবে। কিন্তু ফান্ডের অর্থ ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা স্পষ্ট না করার অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড প্ল্যান্টে কনডেনসেট প্রসেসিং করে পেট্রোল, অকটেন ও এলপিজি উত্পাদন করা হয়। তাদের থেকে গ্যাস নিয়ে থাকেন কৈলাশটিলা এলপিজি প্ল্যান্ট। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিতে উত্পাদিত পেট্রোলিয়ামের মান নিয়ে অভিযোগ ওঠায় প্ল্যান্টে উত্পাদন বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় কৈলাশটিলা প্ল্যান্ট এলপিজি পাচ্ছে না। তবে এলপিজি লিমিটেডের কর্মকর্তারা জানান, মান নিয়ে আদালতে মামলা দায়ের উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসির এলপি গ্যাস বাজারজাতকরণ নিয়ে কোনো মহলের ইন্ধন রয়েছে কি না খতিয়ে দেখা উচিত।
জানা যায়, কৈলাশটিলায় এলপিজি প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় প্রায় ৩২ জন কর্মী অলস সময় কাটাচ্ছেন। প্ল্যান্টের মূল্যবান যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করতে করতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই প্ল্যান্টের জনবলের পেছনে বেতন ভাতা ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা খরচ হয়। তাদের ফান্ডের টাকা খরচ হয়ে যাওয়ায় গত মাস থেকে চট্টগ্রামের এলপিজি প্ল্যান্ট থেকে বেতনভাতার ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। আর চট্টগ্রাম প্ল্যান্টে প্রতি মাসে ৫৬/৫৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়ে থাকে। কৈলাশটিলায় এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে প্রতিষ্ঠানটি চরম আথিক সংকটে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এলপিজির দাম বাড়ানোর জন্য গত ১৪ জানুয়ারি গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। বেসরকারি এলপিজি বাজারজাতকরণ নিয়ে ইচ্ছামতো মূল্য আদায়ের কারণে সরকার একটি সমন্বিত বাজারজাত নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে বিপিসির এলপিজি থেকে বেসরকারিগুলো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। শুনানিতে বিপিসির সাড়ে ১২ কেজি ওজনের গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে এলপিজি লিমিটেড। বিইআরসি কারিগরি কমিটি সারা দেশে একই মূল্যে বিক্রির সুবিধার্থে এর সঙ্গে ক্রস সাবসিডি ফান্ডের অর্থ যোগ করে ৯০২ টাকা করার প্রস্তাব করে। ৯০২ টাকা থেকে ৩৩৩ টাকা কেটে ক্রস সাবসিডি ফান্ডে জমা হবে।
অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বর্তমানে প্রতি কেজি ১০৪ টাকা ৯৩ পয়সা হিসাবে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে বলে জানান। বিইআরসি এই মূল্য ৭২ টাকা ২৪ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করে। এছাড়া ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার খুচরা পর্যায়ে ১ হাজার ২৫৯ টাকা করার বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের বিপরীতে কারিগরি কমিটি এটি ৮৬৬ টাকা নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছে। তবে বাজার মূল্য নির্ধারণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে বিপিসির এলপিজির প্রতি সিলিন্ডারের মূল্য ৯০২ টাকা আর বেসরকারি কোম্পানির সিলিন্ডারের মূল্য ৮৬৬ টাকা নির্ধারণ করা হলে বাজারে বৈষম্যের সৃষ্টি হবে বলে জানান এলপি গ্যাস লিমিটেডের কর্মকর্তারা। খুচরা বাজারে বিপিসির এলপিজি কেউ কিনতে আগ্রহী হবে না। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বলা হচ্ছে বিপিসির এলপিজি থেকে সংগ্রহকৃত টাকা দেশের এলপিজি খাতের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। কিন্তু বেসরকারি খাত থেকে টাকা সংগ্রহের কথা বলা হয়নি। ক্রস সাবসিডি ফান্ডের টাকা নিয়ে উন্নয়নের কোনো পরিকল্পনাও স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
জানতে চাইলে এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছি। বাজার মূল্যে বৈষম্যের সৃষ্টি হলে বিপিসির এলপি গ্যাস বাজার হারাবে।
উল্লেখ্য, দেশে বছরে এলপিজি ব্যবহারের পরিমাণ ১ লাখ টন। তার মধ্যে ৯৮ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে আসে।