কোনো অপরাধকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আলোচনা-সমালোচনা যা-ই হোক, রাজধানীর কলাবাগানে ঘটে যাওয়া ঘটনার মূল হোতা দিহানের বিচার দ্রুত বিচার আইনে হওয়াই দরকার। আইনের সঠিক প্রয়োগে হত্যা-ধর্ষণের মতো সব অপরাধ কমে আসবে। তবে এটাও সত্য, দিহান ও আনুশকার অভিভাবকদের দায়ও কি আমরা এড়াতে পারি? কোনোভাবেই দায় এড়ানো যাবে না। ঘটনার পর থেকে আমরা যারা জেনে ও না জেনে সমালোচনা করছি, তারাও কম অপরাধী নই।
গ্রুপ স্টাডির জন্য অভিভাবকদের জ্ঞাতার্থেই আনুশকা দিহানদের বাসায় গিয়েছিল। উঠে আসছে তাদের মধ্যকার সম্পর্কের কথা। অবাধ মেলামেশার সুযোগে দিহানের বাসায় আনুশকা গিয়েছে। আর এই সুযোগ পুরোটাই গ্রহণ করেছে পশুকামী বর্বর দিহান। দুজনের বয়সই খুব কম। দুই পরিবারেরই প্রশ্রয় কিংবা দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়।
যেহেতু ধর্ষণের পর খুনের অভিযোগ উঠছে, তাতে প্রেম-ভালোবাসার কথা বলে দিহানের কিছুটা পক্ষ নেওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। তার প্রচলিত আইনে সাজা হোক, এটা সবারই কাম্য হওয়া উচিত।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমরা কিছু অনাকাঙ্ক্ষীত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য দেখছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা দেখে ব্যথিতই হতে হয় আমাদের। আনুশকার ধর্ষণ ও মৃত্যুর খবরের নিচে অসংখ্য মানুষ নোংরা, অসভ্য, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, যা কিনা আরেক ধরনের অপরাধ। ধর্ষণ কিংবা হত্যাকে সমর্থন করার অপরাধ এটা। কোনো হত্যাকাণ্ডকেই প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই; ধর্ষণের ঘটনায় তো নয়ই।
দিহান ও আনুশকার মধ্যে সম্পর্ক থাকতেই পারে, সেটা ভিন্ন কথা। জোরপূর্বক পশুবৃত্তি অপরাধ, স্ত্রীর সঙ্গে জোরপূর্বক যৌনতাও ধর্ষণের অপরাধ। কদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব সমালোচনা পড়ে কেবলই মনে হয়েছে ওরাও পশু; ওরা আরেক ধরনের ধর্ষক। হত্যার প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ওদেরও বিচার হওয়া উচিত। এমন একটা ভয়াবহ ঘটনা, যা কিনা সারা দেশের মানুষের হূদয়ে দাগ কেটেছে, সেই প্রসঙ্গে অযৌক্তিক ও অশ্লীল মন্তব্য ওরা করে কীভাবে? কেউ কেউ লিখেছে—ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ছেলেমেয়েরা নাকি এমনই হয়। আনুশকার চরিত্র কেমন ছিল, তার পোশাক কেমন ছিল? মেয়েটি একা একা বন্ধুর বাড়িতে গেল কেন? সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অনেকে।
চিকিত্সক মৃত মেয়েটিকে হাসপাতালের মর্গে যেমন কাটাছেড়া করেছেন, সমালোচকেরাও তেমন মেয়েটাকে কাটাছেড়া করতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। এমনকি মেয়েটা যে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে—এ নিয়েও উল্লোসিত বাক্য প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। কলাবাগানের ঘটনা কি আদৌ ধর্ষণ, তা খতিয়ে দেখতে একশ্রেণির সমালোচক তো এরই মধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন। এটা ধর্ষণ নাকি সম্মতিক্রমে করা যৌনতা, এটা দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত গণধর্ষণ—কত শত প্রশ্ন এসব সমালোচকের মনে।
অপসংস্কৃতি আর ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন ধর্ষণ রোধের অন্তরায় মনে করা হয়। অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করছে, তা হাল আমলের ধর্ষণের চিত্র দেখলেই আন্দাজ করা যায়। শুধু ধর্ষণ নয়; ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনা অহরহ ঘটছে। অপরাধীর সাজা না হলে এজাতীয় অপরাধ বাড়তেই থাকবে। বিশ্বের যেসব দেশে এজাতীয় অপরাধ বাড়ছে, তার উল্লেখযোগ্য কারণ সাজা না হওয়া।
দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ ইত্যাদির পরিবর্তে নেতিবাচক মানসিকতার বিস্তৃতি ঘটছে। সমাজ থেকে মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। নিঃশর্ত ভালোবাসা বা ভক্তি কমে যাওয়ার কারণে আমাদের গঠনমূলক মনোভাব বা সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে আমাদের ভোগের মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। একশ্রেণির কুরুচিপূর্ণ পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি এসব অপরাধ বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এমনকি শিক্ষাগত যোগ্যতাও তাদের এই মানসিকতা বদলাতে পারে না।
অন্যায়কারী জঘন্য অন্যায় করার পরও আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয় না। এজন্য অবশ্য রাজনৈতিক চাপও দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে আইন সমানভাবে কার্যকর হয় না। ধর্ষণের আইন আছে ঠিকই, তবে তার যথাযথ প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আইন যারা প্রয়োগ করবেন, তারা ঐ আইনের পথে হাঁটেন না। কখনো অর্থের লোভ, কখনো-বা হুমকি-ধমকিতে শুরুতেই গলদ দেখা দেয়। মামলার চার্জশিট গঠনের সময় ফাঁকফোকর থেকে যায়। তাই আদালতের রায়ে ধর্ষিত কিংবা নির্যাতনের শিকার সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এসব মামলার ক্ষেত্রে চার্জশিট গঠনের সময় কোনো ম্যাজিস্ট্রেট অথবা পুলিশের কোনো পদস্থ কর্মকর্তা দ্বারা নজরদারি করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রিপোর্টের সময় ভিকটিমের স্বাক্ষাত্কার গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে চার্জশিট দাখিলের ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি হয়, তা কমে আসবে।
নারীদের জন্য ঘরের বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এটা স্পষ্ট যে বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। এজন্য সততা, আন্তরিকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সেই সঙ্গে একধরনের অপরাধের জন্য অপরাধীকে অন্য ধরনের অপরাধে সাজা যেন ভোগ না করতে হয়, তা সরকার সংশ্লিষ্টদের সজাগ থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা দরকার, প্রশাসন তা সুনিশ্চিত করবে এটাই সবার প্রত্যাশা।
ইত্তেফাক/এএইচপি