ভাবিতে হইবে, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর

 ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল।’ কথাটি সুকুমার রায় তাহার হযবরল কাহিনিতে বলিয়াছেন। হযবরল কাহিনির মতো অবস্থা আমাদের সমাজের ছত্রে ছত্রে দেখা যায়। যেমন—ডিএনএ পরীক্ষার পর এক নারীর লাশ হইয়া গেল পুরুষের লাশ! ইহা ডিএনএ প্রযুক্তির সমস্যা নহে। সমস্যাটির ভূত সরিষার মধ্যেও থাকিতে পারে, আবার ইহা অবহেলা বা উদাসীনতার কারণেও হইতে পারে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট খবরটিতে বলা হইয়াছে, পারিবারিক কলহে খুন হওয়া এক নারীর গলিত লাশ উদ্ধারের পর প্রস্তুত করা হয় সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গলিত মরদেহটি একজন অজ্ঞাতনামা নারীর। নিহতের হাতে থাকা সোনালি রঙের চুড়ি দেখিয়া তাহার পিতা-মাতাও লাশটিকে তাহাদের মেয়ে হিসাবে শনাক্ত করেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করিয়া নিহত নারীর পরিচয়ও নিশ্চিত করেন তাহার স্বামী। অথচ পরবর্তীকালে ডিএনএ পরীক্ষায় বদলাইয়া যায় মৃত ঐ নারীর পরিচয়। ডিএনএ প্রতিবেদনে বলা হয়, অজ্ঞাত মৃতদেহের হাড় হইতে একজন পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গিয়াছে।

প্রশ্ন হইল, সুরতহাল, ময়নাতদন্ত, বাবা-মা ও স্বামীর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া একটি নারীর লাশ কী করিয়া পুরুষের লাশ হইয়া গেল? সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক, যেই লাশের হাড় হইতে ডিএনএ প্রোফাইল করা হইয়াছে, সেই লাশটি আসলে ঐ নারীরই নহে, অন্য কোনো অজ্ঞাতনামা পুরুষের। অথবা নমুনা সংগ্রহের সময় ইহা পালটাইয়া যাইতে পারে। তাহা ইচ্ছাকৃতও হইতে পারে, আবার অবহেলাজনিত কারণেও হইতে পারে। কোনো সন্তানসম্ভবা নারীর ইউরিনের স্যাম্পল কোনো পুরুষের নামে ঢুকিয়া যাইবার পর যেমনটি রিপোর্ট আসে—ঐ পুরুষটি গর্ভধারণ করিয়াছে, সমস্যাটি সেইরূপও হইতে পারে। ইত্তেফাকের সংবাদে আরো জানা গিয়াছে, ঐ নারীর মরদেহের নমুনা দেওয়া হইলেও ডিএনএ পরীক্ষায় কীভাবে পুরুষের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল পাওয়া গেল,  তাহা স্পষ্ট করিয়াছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি বলিয়াছেন, লাশের ময়নাতদন্ত শেষে নমুনাস্বরূপ ডান হাতের কনুইয়ের নিচের দুটি হাড় সংরক্ষণের জন্য ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ হইতে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিভাগীয় ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ঐ ল্যাবরেটরিতে গিয়া ডিএনএর জন্য সংরক্ষিত আলামতের স্থানটিতে দেখা যায়, অন্তত হাজারখানেক নমুনা আলামত পলিথিনের ব্যাগে ও কাগজে মোড়ানো খামে পৃথক পৃথকভাবে রাখা হইলেও শনাক্তকরণ লেভেলবিহীন অবস্থায় রহিয়াছে। সুতরাং ইহা হইতে ধারণা করা যায় যে, অত্র মামলার সঠিক আলামত চিহ্নিত করিয়া ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় নাই। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়া গেলে যাহা হয়, ইহা তাহাই।

এখন প্রশ্ন হইল, ঐ নারীকে তাহা হইলে কে হত্যা করিল? সন্দেহাতীতভাবে যদি কোনো মামলা প্রমাণ করা না যায়, তাহা হইলে ইহার সুবিধা কিন্তু আসামিপক্ষ পাইয়া যাইবে। সুতরাং ডিএনএ-এর নমুনা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়া গেলে তাহা মামলার গতিপথ সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করিতে পারে। এই ব্যাপারে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গেজেডে ডিএনএ আইনে বলা হইয়াছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি অসত্ উদ্দেশ্যে ডিএনএ নমুনা ধ্বংস, পরিবর্তন, দূষিত বা জাল করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির উক্ত রূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ১০ (দশ) বত্সর কারাদণ্ড, তবে ৩ (তিন) বত্সরের নিম্নে নহে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’ সুতরাং নমুনা সংগ্রহে দায়িত্বে অবহেলার কোনো সুযোগ নাই। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইহার সহিত ন্যায়বিচার পাইবার বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত বিধায় সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে সতর্ক হইতে হইবে। এই অপরাধে দুষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বা যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার দৃষ্টান্ত থাকা প্রয়োজন।