টঙ্গিবাড়ীর শতাধিক পরিবার সংকটে
শিল্প রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ দাবি
কাজী কাউছার, টঙ্গিবাড়ী (মুন্সীগঞ্জ) সংবাদদাতা
এক সময় টঙ্গিবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির কদর ছিল দেশব্যাপী। অথচ কালের বিবর্তনে শিল্পটি এখন বিলুপ্তির পথে। অল্প দামে মেলে প্লাস্টিকের পাটি। নানা রঙ-নকশায় তৈরি এ পাটি শীতলপাটির চেয়ে টেকসইও বটে। তবে দামে সস্তা, সহজলভ্য ও দৃষ্টিনন্দন হলেও প্লাস্টিকের পাটি এবং শীতলপাটির মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। প্লাস্টিকের পাটি রুক্ষ কৃত্রিমতায় ভরা। পক্ষান্তরে শীতলপাটি নরম, মোলায়েম ও প্রাকৃতিক। এর রঙ-নকশায় যেমন চোখ জুড়ায়, শীতল পরশ মনেপ্রাণে জোগায় প্রশান্তি। শীতলপাটি পরিবেশবান্ধব, আর প্লাস্টিকের পাটি বিরূপ তথা প্রকৃতি বিধ্বংসী। তারপরও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে শীতলপাটি। এর কারণ নানাবিধ। আগের মতো মেলে না এ পাটি তৈরির কাঁচামাল ‘মুর্তা’ বা পাটিবেত বা মোস্তাক। এক সময় ঝোপঝাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতো মুর্তা। গুল্ম জাতীয় এক ধরনের উদ্ভিদ এ মুর্তা দেখতে অনেকটা ছোট বাঁশের মতো। এর ছাল তুলে বেতি উঠিয়ে বোনা হয় পাটি। আর প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয় নানা রঙ ও নকশা। এখন ধীরে ধীরে উজাড় হচ্ছে বন। হারিয়ে যাচ্ছে অন্য উদ্ভিদের পাশাপাশি মুর্তাও। তারপরও দেশের বিভিন্ন স্থানে কমবেশি মেলে মুর্তা। তবে সিলেট ও লক্ষ্মীপুর ছাড়াও আরো বেশ কিছু এলাকায় পাওয়া যায় শীতলপাটি তৈরির এ কাঁচামাল। কিন্তু গুনতে হয় আগের তুলনায় বহুগুণ দাম। কমেছে এর গুণমানও। সে তুলনায় বাড়েনি শীতলপাটির দাম। সহজলভ্য প্লাস্টিকের পাটির কাছে দিনদিন কোণঠাসা হচ্ছে শীতলপাটি। কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এর কারিগররা। যারা বংশ পরম্পরায় এ শিল্প ধরে রেখেছেন তারা এখন মহাসংকটে। কেউ অন্য পেশায় যেতে না পেরে টিকে আছেন কোনো রকম। কেউ কেউ শেষ চেষ্টা করছেন পেশা ধরে রাখার জন্য। তেমনি টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাপুর গ্রামের পাইকপাড়া গ্রামে রয়েছে শতাধিক পরিবার। যারা হাজারো প্রতিকূলতায়ও আঁকড়ে ধরে আছেন পূর্বপুরুষের পেশা। তবে আর কত দিন চলবে এ জীবন সংগ্রাম তা তারা জানে না।
কথা হয় পাটিকর বা পাটিয়াল বিশ্বনাথ ভদ্র ও তার স্ত্রী পুষ্পরাণী ভদ্রের সঙ্গে । তারা জানান, শিতলপাটি শিল্পের কারিগররা পরিবার-পরিজন নিয়ে দুঃখ, দুর্দশা এবং চরম আর্থিক কষ্টে জীবন-জীবিকা চালিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে এই শিল্পের বিলুপ্তি ঘটবে বলে মনে করছেন তারা। পুষ্পরাণী ভদ্র জানান, প্লাস্টিকের পাটি বাজারে আসার পর থেকে অনেকটাই কমেছে বেতি পাটির চাহিদা। এতে ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে সংযুক্তরা দীর্ঘদিন যাবত্ নানা শঙ্কায় জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কোনো মতে টিকে থাকা শিল্পটি করোনা পরিস্থিতিতে বাজার বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে। একেবারেই ক্রেতা-পাইকার শূন্যতার মুখে বিক্রি হচ্ছে না এই পাটি। এ অবস্থায় কারিগররা অনেকেই যুক্ত হচ্ছে অন্য পেশায়। বিশ্বনাথ ভদ্রও জানান একই কথা।
আকার অনুযায়ী একেকটি পাটি তৈরিতে খরচ হয় ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। তা বিক্রি হয় সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। তৈরিকৃত পাটি হাট ও বাড়ি থেকে পাইকাররা কিনে নিয়ে যায়। তবে করোনা পরিস্থিতিতে বর্তমানে হাট বসে না বললেই চলে। আগের মতো পাটির চাহিদাও নেই। কিন্তু উত্পাদন খরচ বেড়েই চলছে। এ বিষয়ে এ শিল্পে জড়িত কয়েক জনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, একদিকে উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি, ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে কোনো মতে টিকে আছেন তারা।
বিশ্বনাথ ভদ্র জানান, পাটি বিক্রি করে তেমন লাভ না হলেও অন্য কাজ তার জানা নেই। তাই বাধ্য হয়ে ধরে আছেন পুরান পেশা। একই আক্ষেপ সান্তনা ও কল্পনা দে নামের দুই প্রবীণ কারিগরের। তারা এ শিল্প রক্ষায় সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন। এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ শিল্পসহায়ক কেন্দ্র (বিসিক) উপব্যবস্থাপক মাহমদুল হাসান জানান, পাটি শিল্পের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সহযোগিতা চাইলে সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।