‘সব কটা জানালা খুলে দাও না/আমি গাইব গাইব বিজয়েরই গান’—দেশাত্মবোধক অমর এই গানের সুরস্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। কিংবদন্তি এই শিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন পরপারে। তবে সত্যিকার অর্থের সবার প্রিয় এই মানুষটির নাম চিরকাল লেখা থাকবে বাঙালির হূদয়ে। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আনন্দ বিনোদনের এবারের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। বীর মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত গীতিকার-সংগীত পরিচালক। ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ওয়াফিজ আহমেদ ও মাতার নাম ইফাদ আরা নাজিমুন নেসা। ঢাকার আজিমপুরের ওয়েস্টটেন্ট উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন এবং শিক্ষাজীবনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ইমতিয়াজ বুলবুল ছাত্রজীবনে মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত অবস্থায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন। এসময় তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরে মেজর আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দারের অধীনে যুদ্ধ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের পর বুলবুল ও তার বন্ধুরা মিলে পাকিস্তানিদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনতাই করে ছোট একটি মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করেন, যাদের ঘাঁটি ছিল ঢাকার জিঞ্জিরায়। জুলাইয়ে বুলবুল ও তার বন্ধু সরোয়ার মিলে নিউ মার্কেটের ১ নম্বর প্রবেশমুখের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লরিতে গ্রেনেড হামলা করেন। আগস্টে ভারতের আগরতলায় কিছুদিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ঢাকায় ফিরে ‘ওয়াই (ইয়াং) প্লাটুন’ নামে একটি গেরিলা দল গঠন করেন। অক্টোবরে পুনরায় ভারত যাওয়ার সময় বুলবুলসহ চারজন কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝামাঝি তন্তর চেকপোস্টে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হন। আটক হওয়ার পর প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে ও পরে এ অঞ্চলের শান্তি কমিটির প্রধান কার্যালয়ে নির্যাতনের শিকার হন। পরবর্তীতে বয়সে ছোট হওয়ায় তিনি মুক্তি পান কিন্তু ঢাকায় তার নিজ বাসা থেকে পুনরায় গ্রেফতার হন ও জাতীয় সংসদের মানিক মিয়া এভিনিউয়ের এমপি হোস্টেলে নির্যাতনের শিকার হন। সেখান থেকে তাকে রমনা থানায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয়ী হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী রমনা থানা থেকে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে। পরবর্তীতে তাকে পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) চিকিত্সা প্রদান করা হয়। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবিতে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তিনি স্বাধীনভাবে গানের অ্যালবাম তৈরি করেছেন এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আব্দুল হাদি, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনক চাঁপাসহ বাংলাদেশি প্রায় সকল জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীকে নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তিনি নিয়মিত গান করেন ১৯৭৬ সাল থেকে।
যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষী ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। অনেকেই যেখানে টাকা আর জীবনের হুমকিতে স্বাধীনতাবিরোধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সাক্ষী দিতে চাননি, চুপ থেকেছেন দিনের পর দিন; সেখানে বাঘের মতোই বীরত্ব দেখিয়েছেন এই গানের মানুষ। ২০১২ সালের আগস্টে ইমতিয়াজ বুলবুল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৯ মার্চ রাতে ঢাকার কুড়িল উড়ালসেতুর পাশ থেকে পুলিশ বুলবুলের ছোট ভাই আহমেদ মিরাজের লাশ উদ্ধার করে। তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি সরকারের কাছে তার নিরাপত্তা বৃদ্ধির আবেদন করেন এবং এটাও উল্লেখ করেন যে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তিনি বেশ কিছু হত্যার হুমকি পেয়েছেন। তিনি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছেন সত্যের কথা, ন্যায়ের পক্ষে, রাষ্ট্রের হয়ে। মৃত্যু তাকে পিছপা করতে পারেনি। ভাইয়ের শোক নিয়ে ঘর থেকেই বের হতেন না গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। নীরবে নিভৃতে কাটিয়েছেন জীবনের শেষ দিনগুলো। এর মধ্যে আসে তারও মৃত্যুর হুমকি। এরপর থেকে সরকারি নিরাপত্তার বলয়ে বাঁধা পড়েন তিনি। শুরু হয় শারীরিক অসুস্থতা। তার হূদযন্ত্রে ৮টি ব্লক ধরা পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিত্সার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তবে সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে তিনি এখন সবার থেকে অনেক দূরে। গত মঙ্গলবার ভোর রাতে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। প্রায় ছয় বছরের গৃহবন্দি জীবন নিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলেন এই কিংবদন্তি। তার সঙ্গী বলতে ছিল একমাত্র পুত্র সামির ও একান্ত সহকারী রোজেন। গান তেমন নিয়মিত করতেন না। গানের মানুষদের সঙ্গেও আড্ডা বা মেলামেশা কমে গিয়েছিল। যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, গৃহবন্দি থেকে মুক্ত মনে হয় কি না জানতে চাইলে গণমাধ্যমে বুলবুল হতাশা নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার গৃহবন্দি জীবন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন আর কিছু মনে হয় না। আপনি তো ভালোভাবে বোঝেন যে, হার্টের চিকিত্সার পর আবার কিন্তু এই চার দেয়ালের মধ্যেই আসতে হবে। এটা কিন্তু সমাধান না। তাই না? আপনারা হার্টটা ঠিক করে আবার এই জায়গাটায় পাঠিয়ে দেবেন, হার্টটা আবার নষ্ট হবে। আপনারা মুক্ত করে দেন।’ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সংগীতবিষয়ক একটি বই লিখে অবসর সময়টা পার করছিলেন। বইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘সার্কল অব সিক্সটিন্থ’। বইটি তিনটি খণ্ডে প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল বুলবুলের। এটি একটি গবেষণাধর্মী বই। তাই লিখতে একটু সময় লাগছিল তার। বইটির প্রথম খণ্ডে ৬২৫ পৃষ্ঠা, দ্বিতীয় খণ্ডে ৩০০ আর শেষ খণ্ডে ৩৫০ পৃষ্ঠা। প্রায় সাড়ে আট বছরের পরিশ্রমের ফসল তার এই বইটি। সংগীত অঙ্গনকে বইটি উপহার দিতে চেয়েছিলেন বুলবুল। কিন্তু সেটি আর নিজের মতো করে প্রকাশ করে যেতে পারলেন না। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। তার মৃত্যুতে পুরো সংস্কৃতি অঙ্গনেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি আর গান লিখবেন না কিংবা কোনো গানেও সুর করবেন না। তবে সবার প্রিয় এই মানুষটি কাজের মাধ্যমে চিরকাল বাঙালির হূদয়ে বেঁচে থাকবেন।