লেবাননের রাজধানী বৈরুতে গত বত্সরের ৪ আগস্ট কী ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহা নিশ্চয়ই অনেকেরই মনে থাকিবে। বৈরুতের বন্দরে সাত বত্সর ধরিয়া মওজুদ রাখা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট হইতে ঘটিয়া যায় অত্যন্ত ভয়াবহ বিস্ফোরণ। অসাবধানতাবশত হঠাত্ আগুন লাগিয়া যায় বন্দরে জমিয়া থাকা বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটে, যাহা ভয়ংকর বিস্ফোরক। ফলস্বরূপ ছারখার হইয়া যায় বৈরুতের গোটা বন্দর এলাকা। প্রাণ হারায় দেড় শতাধিক মানুষ, আহত হয় আরো পাঁচ সহস াধিক। ঘরছাড়া হয় লক্ষাধিক মানুষ। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ধসিয়া পড়ে বড় বড় বহুতল ভবন। বৈরুতের বন্দর এলাকায় এই বিস্ফোরণ হইয়াছিল সাত বত্সর পূর্বের ছোট্ট একটি ভুল পদক্ষেপে। ২০১৩ সালে রাসায়নিক বোঝাই রাশিয়ান কার্গো জাহাজ বৈরুতের বন্দরে অপরিকল্পিতভাবে ভিড়িয়াছিল বিধায় উহাকে জব্দ করা হয়। এবং ঐ জাহাজ হইতে বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নামাইয়া মওজুদ করা হয়। তাহার পর ছোট্ট ভুলে যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটিয়াছে।
এই দুর্ঘটনা সমগ্র বিশ্বের জন্যই বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকেও আমাদের বন্দরসমূহে মওজুদ করা বিস্ফোরক লইয়া উদ্বেগ জানানো হইয়াছে। জানা গিয়াছে, বিপজ্জনক বিস্ফোরকের স্তূপ জমিয়া রহিয়াছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা—স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরগুলিতে। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এই সকল বিস্ফোরক মওজুদ থাকায় সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রহিয়াছে বন্দরগুলি। অথচ এই সকল বিপজ্জনক বস্তুর স্তূপ নাকি সরানো যায় নাই নানান জটিলতার কারণে। প্রশ্ন হইল, বিভিন্ন আইনি ও নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা থাকিতেই পারে; কিন্তু বিপজ্জনক বস্তু সরাইবার ক্ষেত্রে কেন বিশেষ নিয়ম থাকিবে না? বৈরুতের ক্ষেত্রেও আমরা দেখিয়াছি বিস্ফোরক বস্তু সরাইতে রাশিয়ার সহিত সাত বত্সর ধরিয়া অনেকবার চিঠি চালাচালি হইয়াছে; কিন্তু তাহার মধ্যেই ঘটিয়া যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ষাটের দশকে সেই যে হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য গুড দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য আগলি’তে একটি বিখ্যাত সংলাপ ছিল—হোয়েন ইউ হ্যাভ টু শুট, শুট; ডোন্ট টক। অর্থাত্ বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে অধিক কথা বলিতে নাই, কাজটি পূর্বে শেষ করিতে হয়। বিস্ফোরক বস্তুর সমস্যা ছাড়াও জানা গিয়াছে, মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরে মালিকবিহীন ৭৫০টি ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ি পড়িয়া রহিয়াছে। ঐ সকল গাড়ির মালিক কাহারা, তাহা খুঁজিয়া বাহির করিতেও হিমশিম খাইতে হইতেছে বন্দর কর্তৃপক্ষকে। দীর্ঘদিন ধরিয়া পড়িয়া থাকিবার কারণে এই সকল গাড়ির ভিতর ও বাহিরের অংশে বিষাক্ত কেমিক্যাল জমিয়া গিয়াছে। সুতরাং এই সকল গাড়ি হইতেও যে কোনো সময় ঘটিতে পারে দুর্ঘটনা।
প্রশ্ন জাগিতে পারে, বন্দর হইতে অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট মালিক তাহার পণ্য কেন খালাস করিতে চাহেন না? এই ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, দেশে পণ্যের মূল্য কমিয়া যাওয়া, আমদানির সপক্ষে মূল দলিলাদি উপস্থাপন করিতে না পারা, অনিয়ম ধরা পড়িবার পর আমদানিকারক কর্তৃক জরিমানা দিতে অস্বীকৃতি জানানো অথবা পণ্য খালাসের ক্লিয়ারেন্স পারমিট (সিপি) না পাওয়াসহ বিবিধ কারণে বহু পণ্যই খালাস করিতে অনিচ্ছুক থাকেন আমদানিকারকরা। এই ক্ষেত্রে কাস্টমস অ্যাক্ট ১৯৬৯-এর ধারা ৮২ মোতাবেক নির্দিষ্ট সময়ে অখালাসযোগ্য পণ্য নিলামে বিক্রয় কিংবা নষ্ট করিবার নিয়ম। জাহাজ হইতে পণ্য খালাস করিয়া দ্রুত না সরাইলে বিপজ্জনক হইয়া উঠিবার আশঙ্কা থাকে। যে কোনো পণ্য বন্দরে রাখার নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রান্ত হইলে সেইগুলি ডিসপোজাল করাটা জরুরি। তাহা ছাড়া, অতিরিক্ত সময় মওজুদ পণ্য দ্রুত অপসারণে একাধিকবার নিলামের পরিবর্তে আইন অনুযায়ী একবারই নিলাম করাটা এইক্ষেত্রে উপযুক্ত হইতে পারে। এই জন্য বিদ্যমান কাস্টমস আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধনের প্রয়োজন হইলে তাহা করিতে বিলম্ব কাম্য নহে।