ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
চাতক পাখির মতো সারা পৃথিবীর মানুষ অপেক্ষা করছিল করোনা মুক্তির আকাঙ্ক্ষিত হাতিয়ার একটি কার্যকরী ভ্যাকসিনের জন্য। শুরু থেকে অনেকের মনে ছিল নানা প্রশ্ন, সংশয় আর বিভ্রান্তি। প্রথম শঙ্কা ছিল আদৌ কি খুব দ্রুত কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা সম্ভব হবে? কারণ একটি নতুন ভ্যাকসিন আবিষ্কার, পরীক্ষানিরীক্ষা, এর কার্যকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানতে দীর্ঘ সময় লাগে, ৫ থেকে ১০ বছর বা তারও বেশি। আধুনিক বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় অগ্রগতির কল্যাণে, সেই সংশয় দূরে ঠেলে মাত্র এক বছরের মধ্যেই সব পরীক্ষার ধাপ সম্পন্ন করে অবশেষে কার্যকরী ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা ইতিমধ্যে অনেক দেশের জনগণ গ্রহণও করেছেন। এরপর জনমনে একের পর এক সংশয়ের উদয় হলো—গরিব বা উন্নয়নশীল দেশের জনগণ কবে ভ্যাকসিন পাবে বা আদৌ পাবে কি না; ভ্যাকসিন কীভাবে বাংলাদেশে আসবে; দাম কত হবে; আমাদের দেশের বিদ্যমান অবকাঠামোতে টিকা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াগুলো যেমন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সরবরাহ, বিতরণ এবং সঠিক প্রয়োগ যথাযথভাবে সম্ভব হবে কি না।
প্রথম তো মনে হতো ‘আমরা ভ্যাকসিন পাব কি পাব না’, যখন পাওয়া গেল তখন প্রশ্ন উঠল, ‘ভ্যাকসিন নেব কি নেব না’। হাতের দোরগোড়ায় ভ্যাকসিন পাওয়ার আনন্দ যখন সর্বত্র, ঠিক তখনই রটানো হলো নানা অপপ্রচার। সামাজিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক, অবৈজ্ঞানিক তথ্য ও গুজব ছড়ানো হলো। সত্যতা যাচাই না করে এমনো খবর রটানো হলো যে, ভ্যাকসিন গ্রহণের ফলে অনেকের মধ্যে তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ মারা গেছেন। শুরু হলো ভ্যাকসিন গ্রহণ নিয়ে জনগণের মধ্যে নানাবিধ আশঙ্কা, ভয় ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব্ব। পরবর্তী সময়ে তদন্তে জানা গেল, কিছু কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে বটে, যা যে কোনো ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেই হতে পারে। সেগুলো তেমন জটিলতর নয় এবং মৃত্যুগুলো ঘটেছে অন্য জটিল রোগের কারণে। সংগত কারণে এরকম বিভ্রান্তি বা বিতর্ক এবং জনমনে জমে থাকা নানা প্রশ্নের বিশ্লেষণ নিম্নে আলোচনা করা হলো।
প্রশ্ন : বাংলাদেশে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন প্রয়োগ কতটুকু নিরাপদ?
যে কোনো ভ্যাকসিন মানুষের শরীরে প্রয়োগের আগে তার কার্যকারিতা, মান, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং সংরক্ষণ সবকিছু গবেষণার ধাপে ধাপে পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। এই টিকা উদ্ভাবনও এর ব্যতিক্রম নয়। ইতিমধ্যেই বিশ্বের কয়েকটি দেশে অনেক মানুষকে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং কোনো জটিলতা বা প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন : গ্রহণকৃত ভ্যাকসিন করোনা প্রতিরোধে কতটা কার্যকরী?
ভ্যাকসিনের দুইটি ডোজ নিতে হবে। প্রথম ডোজটি গ্রহণের কিছু দিন পরেই শরীরে কিছুটা প্রতিরোধের ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। তবে প্রথম ডোজটি নেওয়ার আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজটিও অবশ্যই নিতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি রোগপ্রতিরোধক্ষমতা অর্জনে সহায়ক হবে। এই টিকা কত দিন করোনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে, তার গবেষণা চলছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য মতে, প্রতিরোধক্ষমতা প্রায় এক বছর পর্যন্ত হতে পারে।
প্রশ্ন : করোনার ভ্যাকসিনের কী কী জটিলতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে?
আমাদের দেশে কিন্তু দীর্ঘ দিনব্যাপী নানা ভ্যাকসিন প্রদানের কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে চলে আসছে। যে কোনো ভ্যাকসিনের মতো করোনা ভ্যাকসিন নিলেও কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন, টিকা নেওয়ার স্থানে ব্যথা, ফোলা বা লাল হয়ে যাওয়া, জ্বর, মাংসপেশি বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা, বমিবমি ভাব ইত্যাদি। এমনকি অ্যালার্জিসহ এনাফাইলেকটিক রিঅ্যাকশনজনিত সমস্যাও হতে পারে। এখন পর্যন্ত গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভ্যাকসিনের জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, যা মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ বা তার চেয়ে কম। জটিলতাগুলো তেমন গুরুতর নয়, দুই-তিন দিনেই টিকা গ্রহণকারী সুস্থ হয়ে উঠবেন।
প্রশ্ন : ভ্যাকসিন গ্রহণের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে কী করতে হবে?
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে অযথা উদ্বিগ্ন না হয়ে চিকিত্সককে জানান এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
প্রশ্ন : কাদের আগে ভ্যাকসিন পাওয়া উচিত?
যারা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছেন, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে ভ্যাকসিন দিতে হবে। প্রথমেই কোভিড রোগীদের চিকিত্সায় নিয়োজিত সরকারি বা বেসরকারি ডাক্তার, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এরপর যাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, যেমন—ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত (উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হূদেরাগ, কিডনি বা লিভারের রোগ, স্ট্রোক)। কারণ এসব মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন—বেশি, তেমনি সংক্রমিত হলে জটিলতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেশি। এছাড়াও নিরাপত্তাকর্মীগণ (পুলিশ, আনসার, সেনাবাহিনী, বিজিবি), সাংবাদিক, পরিবহনকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং জনপ্রতিনিধিগণ।
প্রশ্ন : কারা এই ভ্যাকসিন নিতে পারবেন না?
যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, গর্ভবতী নারী, যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে, বেশি বয়স্ক মুমূর্ষু রোগী এবং যাদের শারীরিক প্রতিরোধক্ষমতা কম (যেমন, ক্যানসারের রোগী যারা কেমোথেরাপি বা রেডিও থেরাপি নিচ্ছেন) তারাও টিকা নিতে পারবেন না। তবে গর্ভবতী মহিলা যাদের পেশাগত বা অন্য কোনো কারণে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন, তারা চাইলে টিকা নিতে পারবেন।
প্রশ্ন : ইতিমধ্যে যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তারা ভ্যাকসিন নেবেন কি না? করোনায় আক্রান্ত অবস্থায় ভ্যাকসিন নেওয়া যাবে কি না?
করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তা দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেয় না। সর্বোচ্চ তিন থেকে ছয় মাস সুরক্ষা দিতে পারে। তাই করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে। তবে আক্রান্ত রোগীরা তিন মাস পরে টিকা নিতে পারেন। কোনো ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত থাকা অবস্থায় ভ্যাকসিন নিতে পারবেন না।
প্রশ্ন : কেউ ভ্যাকসিন গ্রহণ করার পর তিনি কি অন্য কাউকে রোগ ছড়াতে পারেন ?
ভ্যাকসিন গ্রহণকারী নিজে হয়তো করোনায় আক্রান্ত হবেন না, কিন্তু যদি তিনি ভাইরাসটি বহন করেন, তাহলে তার মাধ্যমে অন্যদের তা ছড়াতে পারে। তাই ভ্যাকসিন গ্রহণ করলেও গ্রহণকারীকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।
প্রশ্ন : ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও আবার করোনা হতে পারে কি না?
কোনো ভ্যাকসিন করোনা প্রতিরোধে শতভাগ কার্যকরী নয়। তাই ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে। তাই ভ্যাকসিন নিলেও কেউ যেন মনে না করেন তার আর করোনা হবে না। তাই ভ্যাকসিন গ্রহণকারীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে। মাস্ক পরিধান করা, হাত সাবান-পানি দিয়ে বারবার ধোঁয়া এবং যথাসম্ভব শারীরিক দ্রুত মেনে চলা—অন্ততপক্ষে এই তিনটি স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে কোনো ঢিলেঢালা ভাব বা উদাসীনতা প্রদর্শন করা যাবে না।
প্রশ্ন : বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের চেয়ে অন্য কোনো উপযোগী ভ্যাকসিন দেওয়া যায় কি না?
যে কোনো ভ্যাকসিন নেওয়ার আগে বিবেচনায় রাখতে হয় তার কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সংরক্ষণ, সরবরাহ এবং ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে কি না। এসব বিবেচনায় অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কারণ ধাপে ধাপে পরীক্ষায় এর কার্যকারিতা ইতিমধ্যে প্রমাণিত, তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। আবার আমাদের দেশের বিদ্যমান ব্যবস্থায় তা সহজেই সংরক্ষণ (২ থেকে ৮ সে. ডিগ্রি তাপমাত্রায়), পরিবহন, সরবরাহ এবং বিতরণও সম্ভব হবে। মূল্যও তুলনামূলক কম। পক্ষান্তরে মডার্না বা ফাইজারের তৈরি ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করতে হয় মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সে. গ্রেড তাপমাত্রায়। সেই ব্যবস্থা আমাদের দেশে খুবই সীমিত।
প্রশ্ন : দেশে সরকারি পর্যায় ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে ভ্যাকসিন আমদানি ও বিপণনের অনুমোদন দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক?
বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি ও বিপণন হলে বিত্তবানরা দ্রুত ও সহজে ক্রয় করে ভ্যাকসিন গ্রহণের সুযোগ পাবেন। তবে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ঢালাও বেসরকারিভাবে আমদানি হলে সেখানে নকল বা ভেজাল ভ্যাকসিন তৈরি, উচ্চমূল্যে বিক্রি, কালোবাজারি বা সরকারি ভ্যাকসিন চুরি করে বিক্রি করার একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এর পরও যদি বেসরকারিভাবে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়, তবে অবশ্যই কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। যেমন—পুরো প্রক্রিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা, ভেজাল ও মান নিয়ন্ত্রণে ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি, অধিক মুনাফা রোধে ভ্যাকসিনের দাম সরকার কর্তৃক নির্ধারণ এবং তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
প্রশ্ন : টিকা গ্রহণ করার সময় গ্রহীতার কাছ থেকে বন্ড সই নেওয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
টিকা গ্রহণের সময় বন্ড সই দিতে হবে শুনে অনেকে ভয় পাচ্ছেন। বন্ড সই নেওয়ার অনুমতি পত্রে রোগীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্ব্বর থাকবে, যা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ভ্যাকসিন দেওয়ার পর গ্রহীতার স্বার্থেই এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাকে ফলো-আপ বা পর্যবেক্ষণ করে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো কি না, টিকা কত দিন সুরক্ষা দেবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া বন্ড সই কিন্তু নতুন কিছু নয়।
প্রশ্ন : টিকা দেওয়ার আগে অ্যান্টিবডি বা অ্যান্টিজেন টেস্ট করার প্রয়োজন আছে কি না।
টিকা গ্রহণের পূর্বে অ্যান্টিবডি টেস্ট করানোর প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন : ভ্যাকসিন নিয়ে কিছু অপপ্রচার চালু আছে, যেমন : মহিলাদের মুখে চুল গজাবে, ছেলেদের কণ্ঠস্বর মেয়েদের মতো হয়ে যাবে, মেয়েরা ছেলেদের মতো কথা বলবে, গলার স্বর কুমিরের মতো হয়ে যাবে ইত্যাদি—এগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে কি?
এসব বক্তব্যগুলো আজগুবি, বানোয়াট, হাস্যকর, অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন।
কোভিড-১৯ রোগটি নতুন, এর সঙ্গে জড়িত প্রতিটি বিষয়ও নতুন। গবেষণায় প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন তথ্য ও ধারণা যোগ হচ্ছে, আর বদলে দিচ্ছে পুরাতন ধারণাগুলোকে। জীবনযাত্রা ও জীবিকা এক প্রকার স্থবির। এর ভয়ংকরী থাবায় মুখ থুবড়ে পড়ছে শিক্ষা, চিকিত্সা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি আর ধর্মীয় চর্চা। এসবের তুলনায় ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিন্তু কিছুই নয়। তাই নির্ভয়ে সবাইকে ভ্যাকসিন নিতে হবে এবং অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
n লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিত্সক