বিপ্লব বিশ্বাস
দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, অশিক্ষিত ও সমাজের অবহেলিত অংশের কিশোর ও তরুণদের সাধারণত চুরি, ছিনতাই, পকেটমারা, মাদক সেবন ইত্যাদি অপরাধের সঙ্গে জড়িত হতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত কিশোর অপরাধের সঙ্গে ধনী, শিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারের স্কুল-কলেজে পড়ুয়া সন্তানদেরও মাদক সেবন, ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িত হতে দেখা যাচ্ছে। প্রাথমিক অবস্থায় তাদের অনেকেই পরিণাম সম্পর্কে না জেনে বা না বুঝেই অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে তাদের সাহস ও অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকে। তখন তারা আর সেই অবস্থা থেকে সহজে ফিরে আসতে পারছে না। এভাবেই শহর গ্রাম সর্বত্রই কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হচ্ছে, যা জাতির জন্য এক অশনি সংকেত। পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কে কিশোর অপরাধের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে বিরাজমান বিশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি, মাদকের সহজ প্রাপ্যতা, ইন্টারনেটের অপব্যবহার ইত্যাদি অনেকাংশেই দায়ী। কিশোর অপরাধকে বর্তমানে শুধু পারিবারিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা না করে বরং জাতীয় সমস্যা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে এবং সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। দেশের প্রতিটি এলাকায় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সমাজকর্মী, অভিভাবক এবং শিশু, কিশোর ও তরুণদের নিয়েই ‘কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ’ কমিটি গঠন করে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির পাশাপাশি অপরাধ জগতের ভয়ংকর ভবিষ্যত্ সম্পর্কেও শিশু-কিশোর-তরুণদের জানাতে হবে।
সন্তানের মঙ্গলের জন্য প্রতিটি পরিবারকেই সবার আগে সচেতন হতে হবে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা অর্থ উপার্জনের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে সন্তানের প্রতি খুব বেশি উদাসীন হয়ে পড়ছেন। সন্তান পারিবারিক আনন্দ, স্নেহ, মায়া, মমতা ও ভালোবাসা থেকেও চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েই বেশি আনন্দ পাচ্ছে। আর মা-বাবা সন্তানের হাতে প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি টাকা দিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন ও ভালোবাসা প্রকাশের চেষ্টা করছেন। এই অতিরিক্ত অর্থই সন্তানের সর্বনাশ ডেকে আনছে। এছাড়া দাম্পত্য কলহও সন্তানের মানসিক অবস্থার ওপর ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মা অথবা বাবা বা উভয়ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বিভিন্ন অনৈতিক বা অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত, যা সন্তানকেও অপরাধপ্রবণ করে তুলতে পারে। কাজেই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের সংযত হতে হবে। নিজেদের মধ্যে পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে হবে। অসত্পথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজের, পরিবারের বা সন্তানের সুখী ও সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়ার চিন্তা পরিহার করতে হবে। নিজেরা ভালো থেকেই সন্তানকে ভালো রাখার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পারিবারিক পরিবেশই সন্তানকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে।
ফরিদপুর