২২ কিলোমিটার হাঁটার মধ্যে সমাজের তিক্ত অভিজ্ঞতা

মুখে বলে, কানে শুনে কোনো বিষয়ে সমালোচনার চেয়ে নিজ চোখে দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই উত্তম। তাই,  বন্ধুরা মিলে শপথ নিয়েছি যেভাবেই হোক মানিকগঞ্জ শহর থেকে ঘিওর হাট পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যাব। ২২ কিলোমিটার পথ আমরা মেইন রোড দিয়ে যাব না, আমরা সমাজের অভিজ্ঞতা নিতে চাই। সমাজের কী কী অপ-কর্মকাণ্ড মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে, উন্নয়নের বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করব। তাই নদীর পার দিয়ে, গ্রামের ভেতর দিয়ে রওনা দিলাম। প্রথমেই যে দৃশ্য আমাদের চোখে কাঁটার মতো বিধে যায়, মানিকগঞ্জ টাউন থেকে পৌলির ভেতর দিয়ে নদীর পার দিয়ে হাঁটার সময়। দেখে অবাক হওয়ারই কথা, নদীর জল এতটা কালো হয়ে গেছে কলকারখানার বর্জ্যে, নদীর আশপাশে মানুষের বাসার নর্দমার নালা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করায় তা বলার ভাষা রাখে না। নদীর নামটি হলো, কালীগঙ্গা নদী। যা বহ্মপুত্র? নদ দুটি শাখায় ভাগ হয়ে মানিকগঞ্জে প্রবেশ করেছে, একটি ধলেশ্বরী ও অন্যটি কালীগঙ্গা নদী। আর তরা ব্রিজের কিছু আগেই যা আবার মিলিত হয়ে কালীগঙ্গা নদী হয়ে মানিকগঞ্জ সদরে প্রবেশ করেছে। এ নদী বেউথা হয়ে একদিকে সিংগাইর ও অন্যদিকে হরিরামপুর উপজেলায় প্রবেশ করেছে। কিন্তু এ অববাহিকার মতো অনেক নদীর জল যদি কুচকুচে কালো থাকে, তাহলে বাংলাদেশে নদীর নাব্য ও নদীর সংখ্যা কমে যাবে না তো কোন দেশে কমবে—তা প্রশ্ন থেকেই যায়। বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন জাতের মাছ উত্পাদন। যার কারণে আগে যেসব নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত, এখন তা শুধু অতীত কল্পনাতেই রয়ে গেছে।  জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক প্রতিবেদন দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২০এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ মাছ উত্পাদনে অবস্থান তৃতীয়, আর প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চীন ও ভারত। কিন্তু তবুও অনেক জরিপে উঠে আসে, বিভিন্ন প্রকারের মাছ উত্পাদন হার কমেছে বাংলাদেশে। কাঙ্ক্ষিত কিছু মাছের উত্পাদন ভালো করে, এশিয়ার মধ্যে একটি পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু স্থায়ী মাছ উত্পাদন হার বাড়ানোর জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা। আর এজন্য প্রাথমিক কাজ হলো নদীকে বাঁচিয়ে রাখা। না হলে নদী একবার হারিয়ে গেলে আর যতই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করি না কেন, নদীর প্রাকৃতিক বয়ে চলা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন কিন্তু কিছু অসত্ ব্যক্তির কারণে উন্নয়ন বিষয়ে বাধার মুখে পড়তে হয় সরকারকে। তাই সরকারকে এর দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। না হলে, নদীময় দেশ একদিন অস্বাস্থ্যকর নদীতে পরিণত হয়ে যাবে। বেলা তখন, ১১টা। আমরা নদী পথ ধরে তরা ব্রিজের ধারে এসে পৌঁছাই। তারপর, মেইন রোডে উঠে হঠাত্ই গাড়ির বেপরোয়াভাবে চালানোর ও ওভারটেক করার প্রবণতা দেখে রোড অ্যাক্সিডেন্টের কথা মনে পড়ে গেল। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার খবরও প্রায় শুনতে পাওয়া যায়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২০’-এ বলা হয়েছে, ৪ হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৩১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৩৭৯ জন আহত হয়েছে। আরেকটি যে জরিপ নড়েচড়ে বসার মতো, ১ হাজার ৩৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, করোনাকালে দুর্ঘটনার সংখ্যা এত হলে, করোনা-পরবর্তী বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা না জানি তিন গুণ না চার গুণ হয়ে যায়। সরকারের অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্ত্বেও ওভারটেকের প্রবণতা কেন বেড়েই যাচ্ছে, এদিকেও নজর দিতে হবে সরকারকে এবং কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দুপুর ২টার দিকে আমরা সমাজের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেষে  ঘিওর হাটে এসে পৌঁছি। এসে একটু ভালো লাগা কাজ করছিল। প্রবেশ করেই দেখতে পেলাম, গ্রামবাংলার সেই পুরোনো স্মৃতি। সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে জমজমাট হাট বসেছে, ঘিওর হাট বসে প্রতি বুধবার। কিন্তু গ্রামবাংলার এ ঐতিহ্যও অনেক জায়গায় হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই, স্থানীয় সরকারকে এর যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। গ্রামবাংলার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় আগে ‘গরু দাবড়ানো ও গ্রাম্য মেলা’ হতো। কিন্তু এখন তাও হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই, স্থানীয় সরকারকে এর যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সমাজের মানুষেরও একযোগে গ্রামের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।

n  লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।