‘মুভি মোগল’ খ্যাত জাহাঙ্গীর খান চলে যাওয়ার দুই বছর

স্বাধীনতার পর যে কজন দাপুটে প্রযোজক বাংলাদেশে চলচ্চিত্রশিল্পকে এগিয়ে নিতে কাজ করেছেন তাদের অন্যতম একেএম জাহাঙ্গীর খান। একের পর এক সুপার-ডুপার হিট সিনেমা প্রযোজনা করে ‘মুভি মোঘল’ হিসেবে উপাধি পেয়েছিলেন। সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) একেএম জাহাঙ্গীর খানের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তার পরিবার থেকে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। গত বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি ৮০ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৭৮ সালে ‘চিত্রালী’ সম্পাদক প্রয়াত আহমদ জামান চৌধুরী তাকে ‘মুভি মোগল’ খেতাব দেন। তখন থেকে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ঢাকার চলচ্চিত্রজগতে এ নামেই পরিচিত হয়ে আসছেন।

এ কে এম জাহাঙ্গীর খান প্রথম আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় ‘নয়নমনি’ নামের সিনেমা প্রযোজনা করেন। সিনেমাটি তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করায় একের পর এক প্রযোজনা করেন ‘তুফান’, ‘বিজয়িনী সোনাভান’, ‘রূপের রাণী চোরের রাজা’, ‘রাজকন্যা’, ‘বাদল’, ‘কুদরত’, ‘আলতাবানু’, ‘সওদাগর’, ‘রাজ সিংহাসন’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘পদ্মাবতী’, ‘সম্রাট’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘ডাকু মর্জিনা’, ‘সোনাই বন্ধু’, ‘রঙিন রূপবান’, ‘রঙিন রাখালবন্ধু’, ‘শুভদা’, ‘রঙিন কাঞ্চন মালা’, ‘সাগর কন্যা’,‘শীষমহল’, ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘ডিসকো ড্যান্সার’, ‘বাবার আদেশ’, ‘আমার মা’সহ অসংখ্য সিনেমা। এসব সিনেমা প্রযোজনার আগে তিনি আলমগীর পিকচার্সের ব্যানারে পরিবেশনা করেন ‘যাহা বলিব সত্য বলিব’, ‘এখানে আকাশ নীল’, ‘অপবাদ’, ‘সূর্যকন্যা’, ‘কি যে করি’, ‘আলিঙ্গন’, ‘সেতু’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘মা’, ‘নোলক’ ইত্যাদি।

তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনায় এসেছিলেন ১৯৭৩ সালে তার বাবা মারা যাওয়ার পর। তবে তারও আগে থেকে সিনেমার পরিবেশক ছিলেন। বাবুল চৌধুরীর ‘সেতু’ সিনেমা দিয়ে ডিস্ট্রিবিউশন শুরু করেন তিনি। মূলত ‘মা’ ছবি দিয়ে তার প্রযোজনা শুরু হয়। ১৯৮৬ সালে তার প্রযোজিত ও চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘শুভদা’ ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ১৩টি সম্মাননা অর্জন করে অনন্য রেকর্ড গড়ে। ১৯৭৬ সালে প্রথম তিনি প্রযোজনা করেন ‘নয়নমণি’ ছবিটি। এর আগে ১৯৭৩ সালে তার প্রথম পরিবেশিত ছবি ছিল ‘যাহা বলিব সত্য বলিব’। ৪৩টি ছবির প্রযোজক ও পরিবেশক তিনি।

এ মুভি মোগল প্রযোজিত সিনেমা টানা ২৫ সপ্তাহ, ৮১ সপ্তাহ, এমনকি ১০৩ সপ্তাহ ধরে প্রদর্শিত হয়েছে। অর্থাৎ রজতজয়ন্তী, সুবর্ণজয়ন্তী, হীরকজয়ন্তী ছুঁয়ে সগৌরবে চলেছে। বাংলাদেশে প্রথম যে ছবিটি টানা ১০৩ সপ্তাহ চলার রেকর্ড গড়েছিল, সেটি হলো আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘নয়নমণি’।

১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ছবিটি তৎকালীন সময়ে প্রায় তিন কোটি টাকার ব্যবসা করে। আর এ ছবির প্রযোজক হলেন জাহাঙ্গীর খান। ২০১৬ সালে এ কে এম জাহাঙ্গীর খান তার প্রযোজনা সংস্থা আলমগীর পিকচার্সের ব্যানারে নির্মিত ৪৩টি ছবির প্রিন্ট, পোস্টার, ফটোসেট, অ্যালবাম বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভকে প্রদান করেছেন।

১৯৩৯ সালের ২১ এপ্রিল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম চিওড়া কাজীবাড়ি মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পুরো নাম আবুল খায়ের মো. জাহাঙ্গীর খান। জীবদ্দশায় বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, শৈশবে বেশ দুরন্ত স্বভাবের ছিলেন তিনি। মাত্র ছয় বছর বয়স থেকে সিনেমা দেখা শুরু করেন। সিনেমা দেখা তার কাছে একটি আদর্শের বিষয় মনে হতো। কানন দেবীর ছবির ভক্ত ছিলেন তিনি। শরৎচন্দ্রের ‘মেজদিদি’র চলচ্চিত্রায়ণ দেখে সিনেমার প্রতি অনুপ্রাণিত হন। সত্যজিৎ রায়ের ছবি তাকে চলচ্চিত্রজগতে আসতে উৎসাহিত করে।

ইত্তেফাক/বিএএফ