জিভে লোল পড়ার মতো হরেক রকমের খাবার কার না ভালো লাগে। আর তা যদি ঘরে বসে রুচিসম্মত সুস্বাদু-তৃপ্তিময় খাবার হয়, তবে কি আর ফিরিয়ে দেওয়া যায়? এমনি দুই তরুণীর মনভুলানো হাতের তৈরি ঘরোয়া খাবার ছোট-বড় সবার মন কড়েছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে। স্বহস্তে ঘরোয়া খাবারের আলোর যাত্রাপথে হাতছানির স্বপ্ন বুনেছেন তারা। মাত্র এক বছরের মাথায় ঘরোয়া খাবার দিয়েই স্বনির্ভর হয়ে উঠেছেন তারা। বিবিএ সম্পন্ন করে খাবার তৈরি এবং মানুষকে খাওয়ানোর প্রতি ভালোলাগা থেকেই ঘরে বিভিন্ন ধরনের মজাদার ও সুস্বাদু রান্নায় হাত দেওয়া শুরু করেন। জাদুকরি হাতের সুস্বাদু ঘ্রাণ যেমন, ঠিক সেরকম তৃপ্তিময় খাবারও। যখন মহামারি করোনার ভয়ংকর থাবা লাফিয়ে লাফিয়ে চারিদিকে ছেয়ে যাচ্ছিল ঠিক তখন স্বহস্তে সৃষ্ট খাবার দিয়ে নিজ প্রতিভায় দীপ্তি ছড়িয়েছে শ্রীভূমি শ্রীহট্টে। করোনাকালে অল্প সময়ের মধ্যে ঘরোয়া খাবার হোম ডেলিভারি দিয়ে বাজিমাত করেছেন নাঈমা কবীর ও ফেরদৌস আক্তার পপি।
পাটিসাপটা, মালপোয়া, চিতই, ভাঁপা, কেক, তেহারি, কাবাব, চটপটি, ফুসকা, বিভিন্ন ধরনের মাছ-মাংস, সবজির তরকারি, পেটিস, গোলাপজাম, পায়েস, সন্দেশ, আইসক্রিম ছাড়াও রয়েছে প্রকারভেদের খাবার। সীমিত পরিসরে এসব ঘরোয়া খাবারের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘরে বসেই মাসে আয় করছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে। অথচ এই ব্যবসা শুরু হয়েছিল মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে। ঘরোয়া খাবারে তাক লাগানো সফলতার কাহিনি জানতে কথোপকথন হয় শ্রীহট্টের দুই রন্ধনশিল্পীর সঙ্গে। প্রশ্ন ছুড়তেই সিলেট শহরের আম্বরখানার বাসিন্দা ফেরদৌস আক্তার পপি প্রতিবেদককে বলেন, বিবিএ শেষ করে মহামারিতে অনেক দিন ধরে ঘরেই থাকতে হতো। তাই ঘরের খাবার তৈরি করে সময় কাটিয়ে দিতাম। যখন ঘরে কোনো বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন আসে, তখন আমি ওদের জন্য নানা ধরনের খাবার তৈরি করতাম। ওরা আমার হাতের তৈরি করা খাবার খেয়ে মুগ্ধ হয়ে বলত, খুবই ভালো হয়েছে।
সিলেট শহরের বাসিন্দা ফেরদৌস আক্তার পপি বলেন, আমার খুবই কাছের এক বান্ধবী ছিল। ও আমাকে এক দিন বলল, তোর হাতের তৈরি কেক আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসবি। যদি ভালো হয়, তবে আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে খাবারের অর্ডার এনে দেব। পরে তার কথামতো আমিও আমার ঘরে যা ছিল তা দিয়ে কেক রেডি করে নিয়ে যাই। কেক খেয়ে সবাই খুব প্রশংসা করল। এভাবে আমার ঘরোয়া খাবারের যাত্রা শুরু হয়। অনলাইনে ব্যবসা প্রসঙ্গে বলেন, ক্রেতাদের কাছে চাহিদা আস্তে আস্তে বেড়ে যাওয়াতে এক দিন আমি ফেসবুকে নিজের একটা পেইজ খুলি। সেখানে মাঝেমধ্যে কয়েকটি খাবারের ছবি তুলে পোস্ট করি। সেখানে দেখা যায়, আমার কাস্টমাররা ভালো ভালো কমেন্ট করছে আর কখনো ছবি দিয়ে বিভিন্ন খাবারের অর্ডার দিচ্ছে। ভাবতে ভালোই লাগে, যে ১০০ টাকা দিয়ে ঘরোয়া খাবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ আমি এক বছরের মাথায় মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকার মতো ইনকাম করতে পারছি। ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি জানান, ঘরোয়া খাবারের ব্যবসা যেহেতু ঘর থেকে শুরু হয়েছে, সেহেতু আমি ঠিক করেছি আমার পরিচিতদের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, দোকান দিয়ে নয়। কেননা দোকান দিলে শুধু দোকানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। আর খাবারগুলো ঝুঁকি নিয়ে খেতে হয়। এছাড়া তৈরি খাবারগুলোও সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেকে আবার অনলাইনে অর্ডার দিতে চায় না নানা ধরনের ত্রুটি থাকার জন্য। বর্তমান সময় আধুনিক অনলাইনের যুগ। তাই আমার পরিচিতদের দ্বারা নিজেকে মেলে ধরতে চাই। তাছাড়া ঘরোয়া খাবার ক্রেতারা বেশি দাম দিয়েও নিতে চায়। তাই আমি খাবারের চাহিদার নতুনত্ব বাড়াতে সম্প্রতি যেসব নিত্যনতুন খাবার রেস্টুরেন্টে আসে, সেগুলো আমি রেস্টুরেন্টে বসেই খেয়ে দেখি। তারপর বাড়িতে এসে একা খাবারগুলো নিজে তৈরি করে চেখে দেখি ঠিক আছে কি না। যদি মানসম্মত সুস্বাদু খাবার হয়, সেটা ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেই।
সিলেট শহরের আরেক বাসিন্দা রন্ধনশিল্পী নাঈমা কবীর বিবিএ পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে বিগত সাত/আট মাস ধরে ঘরোয়া খাবার হোমডেলিভারি ব্যবসায় মন দিয়েছেন। জানতে চাইলে নাঈমা প্রতিবেদককে বলেন, বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা আর মানুষকে খাওয়াতে আমার খুব ভালো লাগে। করোনা লকডাউনের সময় মানুষ বাইরের খাবার খেতে চায়নি ঝুঁকি থাকার জন্য। তাই আমি নিজে থেকে ঘরোয়া খাবারের ব্যবসায় মন দিয়েছি পরিচিতদের মধ্যে হোমডেলিভারি দিয়ে। পরে ধীরে ধীরে অনলাইনে নিজের একটি পেইজ খুলি। এরপর থেকে আমার ঘরোয়া খাবারের ব্যবসায় বেশ সফলতা আসে। যে ঘরোয়া খাবারের ব্যবসা মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন মাসে রোজগার করতে পারছি ৩০/৩৫ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে। ইচ্ছে আছে, ভবিষ্যতে কিছু কর্মী রেখে একটি দোকান পরিচালনা করার।