যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে ফের অভিশংসন থেকে রক্ষা পেলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও একবার সিনেটে গিয়ে একইভাবে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। যদিও এবার সাত রিপাবলিকান ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিচারের পর ট্রাম্প বলেছেন, রাজনৈতিক আন্দোলন কেবল শুরু হয়েছে। আর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের অবস্থা নাজুক, এটাকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের
গত ৬ জানুয়ারি কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য মার্কিন সিনেটে যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন ছিল, তার চেয়ে কম হয়েছে। সিনেটরদের মধ্যে ৫৭ জন ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন, এর মধ্যে সাত জন রিপাবলিকান সিনেটর আছেন। বিপক্ষে ভোট পড়েছে ৪৩টি। কিন্তু দোষী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য ৬৭টি ভোট প্রয়োজন ছিল। সে হিসেবে ট্রাম্পকে অভিশংসন করার পক্ষে ১০টি ভোট কম ছিল। এটি ছিল ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিশংসন। ২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরো একবার অভিশংসনের চেষ্টা হয়েছিল। যদি তিনি দোষী সাব্যস্ত হতেন, সিনেট তাকে আবারও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে বাধা দেওয়ার পক্ষে ভোট দিতে পারত।
ভোটাভুটির পর কংগ্রেসের সিনিয়র রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল বলেছেন, ট্রাম্প ক্যাপিটল হিলে হামলার পেছনে দায়ী ছিলেন এবং তিনি একে অসম্মানজনক এবং দায়িত্বের প্রতি চরম অবহেলা বলে উল্লেখ করেছেন। এর আগে তিনি ট্রাম্পের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট পদে না থাকায় এই প্রক্রিয়াকে অসাংবিধানিক বলে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের দায়িত্ব ছাড়ার আগ পর্যন্ত ম্যাককনেল তার বিচার স্থগিত রাখতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে ম্যাককনেল ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে তাকে হয়তো এখনো আদালতের মুখোমুখি হতে পারে। ম্যাককনেল বলেন, তিনি এখনো পালিয়ে যাননি। তাছাড়া আমাদের দেশে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা রয়েছে, আমাদের দেওয়ানি মামলার ব্যবস্থা রয়েছে এবং সাবেক প্রেসিডেন্টদের কেউ এর কোনটি থেকে জবাবদিহিতার হাত থেকে রেহাই পান না।
শনিবার কী হয়েছিল?
সিনেটের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি তদারক করার জন্য প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের নিযুক্ত করা হয়। তারা তাদের সমাপনী বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি করেছেন যে ট্রাম্পকে অব্যাহতি দেওয়া বিপজ্জনক হবে। প্রতিনিধি জো নেগুস বলেন, এর চাইতে বেশি ঝুঁকির আর কিছু হতে পারে না, কারণ কঠিন সত্যটি হলো ৬ জানুয়ারি যা ঘটেছে তা আবারও ঘটতে পারে। প্রতিনিধি ম্যাডেলেইন ডিন বলেছেন, ইতিহাসে এ ঘটনা থেকে যাবে। আমি আপনাদের অন্য পথে না যাওয়ার জন্য বলছি। তবে ট্রাম্পের আইনজীবী মাইকেল ভ্যান ডার ভিন এই প্রক্রিয়াকে লোক দেখানো বিচার বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই অভিশংসন শুরুর থেকে শেষ পর্যন্ত তামাশা ছাড়া কিছুই ছিল না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের দীর্ঘদিনের যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছিল সেটাই এসব ঘটনায় সামনে এসেছে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
অব্যাহতি পাওয়ার পরে ট্রাম্প এই বিচারপ্রক্রিয়াকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘উইচ হান্ট’ হিসেবে নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। বিচারের পরপরই তিনি এই বিবৃতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেছিলেন যে, কোনো প্রেসিডেন্টকে এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি এবং আমেরিকাকে পুনরায় শ্রেষ্ঠ করে তোলার আন্দোলন সবে শুরু। তিনি বলেন, সামনের মাসগুলোতে অনেক কিছুই আপনাদেরকে জানাব। আমাদের জনগণের জন্য আমেরিকাকে শ্রেষ্ঠত্ব করতে সামনের দিকে এগিয়ে যাব।
গণতন্ত্র নাজুক : বাইডেন
সিনেটে অভিশংসনের বিচারের সিদ্ধান্তের পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক বিবৃতিতে বলেছেন, এটা আমাদের ইতিহাসের দুঃখজনক একটা অধ্যায় যে আমাদের গণতন্ত্র এখন নাজুক অবস্থানে। আমাদের এটাকে রক্ষা করতে প্রহরীর ভূমিকায় থাকতে হবে। প্রেসিডেন্ট বলেন, আমেরিকায় সহিংসতা এবং চরমপন্থার কোনো স্থান নেই। এ জন্য প্রত্যেক আমেরিকানের বিশেষ করে নেতাদের মিথ্যাকে পরাজিত করতে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
বিবিসির বিশ্লেষণ
বিবিসির উত্তর আমেরিকার সংবাদদাতা অ্যান্থনি জার্চার বলছেন, প্রাথমিক অবস্থাতে বলা যায় যে, এটি সাবেক প্রেসিডেন্টের জন্য একটি জয়। তিনি যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চান তাহলে তিনি ২০২৪ সালে আবারও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পদে দাঁড়াতে পারবেন। তার ভিত এখনো অক্ষত আছে। প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটে উভয় কক্ষের বেশির ভাগ রিপাবলিকান এই অভিশংসন প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছেন। যারা এই ব্যাপারে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন তারা ইতিমধ্যে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদেরকে তিরস্কার করেছেন রিপাবলিকান নেতারা। তবে ট্রাম্প এই অভিশংসন বিচার থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসেছেন সেটাও বলা যাবে না। ‘অভিশংসন পরিচালকদের দ্বারা পরিচালিত এই বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম স্মরণীয় বিষয় হলো—ট্রাম্প-সমর্থকদের নতুন ভিডিও যেখানে মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন টুপি পরে এবং ট্রাম্পের পতাকা উড়িয়ে ক্যাপিটলে তাণ্ডব চালিয়েছিল। এই ছবিগুলো চিরকাল ট্রাম্পের নামের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তিনি এখন থেকে যে মিছিল বা সমাবেশ করুন না কেন সেটা এই দাঙ্গার স্মৃতি মনে করিয়ে দেবে। এটি হয়তো তার রিপাবলিকান পদমর্যাদা এবং নথিতে কোনো সমস্যা করবে না, তবে স্বতন্ত্র ভোটার এবং মধ্যপন্থিদের এই ঘটনা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।