ভালোবাসার শেষ আশ্রয় ‘আপন নিবাস’

যাদের একবেলা খাবার জুটাতে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করে সময়ের পর সময় গড়িয়ে যেতো। ছেলে-মেয়েদের আদর আর ভালোবাসা পেতে যারা ব্যাকুল। কেউ হয়তো রাস্তায় প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতেন। যাদের পৃথিবীতে ভালোবাসার আপন মানুষ আর নেই। এই ইট-পাথরের শহরে রাজধানীর উত্তরখানে এমন অসহায় বয়োজ্যেষ্ঠ ও সুবিধাবঞ্চিত দুস্থ নারীদের ভালোবেসে আপন করে জায়গা দিয়েছে আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রম। 

কেউ মেঝে শুয়ে আছেন, কেউ পা গুটিয়ে আপন খেয়ালে দোল খাচ্ছেন, কেউ জানালার ফাঁকে উদাস চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার অনেকেই একই সঙ্গে বসে গল্প করছেন। দেখলে মনে হবে অদৃশ্য স্বজনদের হারানো ভালোবাসা যেন নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন তারা। এমন অসংখ্য দৃশ্য চোখে পড়বে মৈনারটেক এলাকার জিয়াবাগ বৈকাল স্কুলের পাশে অবস্থিত এ বৃদ্ধাশ্রমে।

মানবাধিকার কর্মী সৈয়দা সেলিনা শেলী ২০১০ সালে ৭ জন অসহায় নারীকে নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমটি চালু করলেও এখন এর সদস্য সংখ্যা ৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। যাদের বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছরের বেশি। তাদের কারও কারও শারীরিক সামর্থ্য নেই। অনেকের মানসিক সমস্যা রয়েছে। তাই আশ্রমই তাদের একমাত্র ভরসা। অনেকেই আসছেন, যাচ্ছেন আবার অনেকেই বসবাসকালীন সময়ে এখানেই মৃত্যুবরণ করছেন।

আশ্রমটির উদ্যোক্তা সেলিনা শেলীর ব্যক্তিগত অর্থায়নে চললেও পরে ট্রাস্টি কমিটির সাহায্যে ও বৃদ্ধাদের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে এখন অনেকেই এগিয়ে আসছেন। তবে নানা অসুবিধায় জর্জরিত এখনো এ বৃদ্ধাশ্রমটি। দীর্ঘদিন যাবত ভাড়া করা জরাজীর্ণ একটি দ্বিতল ভবনে বসবাস করে আসছেন এ সকল বৃদ্ধারা। একই বিছানায় ৭ থেকে ৮ জন বৃদ্ধাকে থাকতে হচ্ছে জায়গার অভাবে৷ 

আশ্রমের প্রবীণ সদস্য বিলকিস বেগম (৬০) জানান, জীবনের শেষ সময়ে স্বজন ছাড়া থাকায় কোন দুঃখ-কষ্ট নেই। আশ্রমের সকল সদস্যকেই আপন করে নিয়েছেন তিনি। 

বৃদ্ধাশ্রমটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা সেলিনা শেলী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘বৃদ্ধাদের খাবারের সমস্যা কিছুটা দূর হলেও এখনো মেলেনি স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। অনেকেই নানারকম রোগে ভুগছেন। অসুস্থদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করতে হয়। করোনার এ সংকট তাদেরকেও ছুঁয়েছে। পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিত্তবানদের পাশে থাকারও অনুরোধ রইলো।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে শিশুটি আজকে জন্মগ্রহণ করেছে যদি তার দেখভাল করার কেউ না থাকে আমরা সে শিশুটিকেও রাখার ব্যবস্থা করবো। যাদের আত্মীয়স্বজন আপন লোক বলতে কেউ নেই পৃথিবীতে তাদের জন্য আমাদের আপন নিবাসের দরজা সবসময় খোলা।’

ইত্তেফাক/এসসিএস