বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী অনুমোদন পাওয়ার সাত বত্সরের মধ্যে নিজস্ব জমিতে গড়িয়া তোলা স্থায়ী ক্যাম্পাসে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম চালাইতে হইবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে; কিন্তু এই নির্দেশনা অহরহ অমান্য করা হইতেছে। এমনকি স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকিবার পরও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া অস্থায়ী ক্যাম্পাসেই শিক্ষা কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছে। তাহাদের আশঙ্কা—স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেলে তাহাদের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমিয়া যাইবে। এই জন্য তাহারা এখনো এই ব্যাপারে গড়িমসি করিতেছে। তবে স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেলে ও ঠিকমতো প্রচার-প্রচারণা চালানো হইলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিবে বলিয়া মনে হয় না। যেইখানে এইবার এইচএসসি পরীক্ষায় করোনা পরিস্থিতির কারণে অটোপাশের মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণা করা হইয়াছে, সেইখানে শিক্ষার্থী পাওয়াটা কোনো সমস্যা হইবে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেলে ঢাকা শহরের উপর চাপ কমিবে। শিক্ষার্থীরাও পাইবে একটি ভালো পরিবেশ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা শুধু ক্লাস হইতেই শিখে না, উন্নত পরিবেশ হইতেও তাহারা উন্নত মানের নাগরিক হিসাবে গড়িয়া উঠিবার সুযোগ লাভ করে। তাই যথাসময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলির স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের নিয়ম যাহাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেই ব্যাপারে অবশ্যই নজরদারি ও তদারকি বাড়াইতে হইবে।
সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাপক বিকশিত হইয়াছে। জনবহুল একটি দেশে ইহাই প্রত্যাশিত। সরকারের একার পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নহে। এই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সম্মুখে রাখিয়া ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে দেশে অনুমোদিত মোট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৭টি। ইহার মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রহিয়াছে ৯৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পায় নাই। আর তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রহিয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৪৯ হাজার ১৬০ জন। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী লইয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন দুর্বার গতিতে আগাইয়া যাইতেছে। তবে অভিযোগ রহিয়াছে যে, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করিলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া খুবই নিম্নমানের। সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হইলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হইতে পারে।
নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকিবার পরও যেই সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ভাড়া বাড়িতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করিতেছে, সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইউজিসিকে চিঠি দিয়া সেই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়াছে। এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুলিয়ায় প্রায় ৬০ একর জায়গা লইয়া গড়িয়া তুলিয়াছে স্থায়ী ক্যাম্পাস। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেক বড় আকারের একটি বিশ্ববিদ্যালয়; কিন্তু তাহারাও অস্থায়ী ক্যাম্পাসগুলি বন্ধ করিতেছে না। একইভাবে মোহাম্মদপুরে স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকিবার পরও ধানমন্ডির অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়। এইভাবে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ১২ বত্সরেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যায় নাই।
তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করিয়াছে ২৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তাহাদের আমরা সাধুবাদ জানাই; কিন্তু যেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক সনদ ও নবায়ন—এই দুই মিলাইয়া এক যুগেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইতে পারে নাই, তাহাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সময় আসিয়াছে। এখন আর উদারনীতি দেখাইবার প্রয়োজন নাই। ২০১০ সালে বেসরকারি আইন প্রণয়নের পর হইতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইবার জন্য সরকার অনেক তাগাদা দিয়াছে। এখন আর হেলাফেলা করিতে দেওয়া উচিত হইবে না।